০৭ মে ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম
‘২২ হাজার টাকা মজুরি দিয়া ৩ কানি জমির ধান কাটছি। ধান পাইছি মাত্র ২০ মণ। পরিপক্ক হওয়ার আগেই কাটতে হওয়ায় ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছি না। বেপারিরা দাম বলছে মাত্র ১০ হাজার টাকা! এই টাকা দিয়া আমি কী করুম? ঋণের কিস্তিই বা কেমনে দিমু? এখন মরা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই!’ অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের কৃষাণী বিলকিস খাতুন।
অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে নাসিরনগরের মেদীর হাওরে অন্তত ৩০৫ হেক্টর বোরো ধানের জমি তলিয়ে গেছে। বিলকিস খাতুনের আরও ১০ কানি জমির ধান এখনো পানির নিচে। তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে তিনি সেই ধান কাটতে পারছেন না। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সব মিলিয়ে এই এলাকায় প্রায় ২ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে নাসিরনগর উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমিই হাওর এলাকায়। গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মেদীর হাওরের ৩০৫ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে।
শুরুতে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ মজুরি দিয়ে ধান কাটা গেলেও, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গত দুদিন ধরে কোনো শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষাণী বিলকিস বেগম জানান, নিজের ও বর্গা নেওয়া মোট ২২ কানি জমিতে তিনি ধান চাষ করেছিলেন। আত্মীয়-স্বজন ও এনজিও (সমিতি) থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদের খরচ মেটান। কিছু ধান বৃষ্টির আগে কাটতে পারলেও বাকিগুলো পাকতে দেরি হওয়ায় আটকা পড়ে যান। তিনি বলেন, ‘এখনো ১০ কানি ধান পানির নিচে। ১ হাজার ২০০ টাকা মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাচ্ছি না। জমিতে গলা সমান পানি, ধান কাটার পরিবেশ নেই। অথচ এই ধান বিক্রি করে কত কী করার স্বপ্ন ছিল! সব শেষ হয়ে গেল।’
বিলকিস বেগমের মতো আরও ২ হাজার কৃষকের সোনালী স্বপ্ন এখন পানির নিচে। এমনকি বৃষ্টির আগে কাটা ধানগুলোও রোদ না থাকায় শুকাতে পারছেন না তারা, ফলে সেগুলো পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মেদীর হাওরের কৃষক আবুল কাশেম জানান, জমির ধান বিক্রির টাকাতেই তার পাঁচ সদস্যের পরিবার চলে। তিন সন্তানের লেখাপড়ার খরচও আসে এখান থেকে। কিন্তু ঢলে তার ৫ কানি জমির সব ধান তলিয়ে গেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই ধান কাটলেও মান ভালো হবে না, বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া যাবে না।’
নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন বলেন, ‘হাওরে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও নতুন করে কোনো জমি প্লাবিত হয়নি। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই ৬০ শতাংশের বেশি ধান কাটা হয়ে গিয়েছিল, তাই ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার জন্য তালিকা তৈরির কাজ চলছে।’
প্রতিনিধি/একেবি