images

সারাদেশ

৪০ বছর পর পাঞ্জাব থেকে ছেলেকে নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে জাহানারা

জেলা প্রতিনিধি

০৩ মে ২০২৬, ১০:০১ পিএম

প্রায় চার দশক আগে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এক নারীর ফিরে আসা—যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। দীর্ঘ ৪০ বছর পর ভারতের পাঞ্জাব থেকে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নিজের জন্মভিটা ঠাকুরগাঁওয়ের শাহাপাড়া গ্রামে ফিরেছেন মোছা. জাহানারা। তার এই ফিরে আসাকে ঘিরে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে এক আবেগঘন পরিবেশ।

রোববার (৩ মে) সকালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের শাহাপাড়া গ্রামে পা রাখতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন জাহানারা। একে একে ভাই-বোন, ভাতিজা-ভাতিজি ও স্বজনদের বুকে জড়িয়ে ধরেন তিনি। চার দশকের দীর্ঘ বিচ্ছেদ যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে যায় অশ্রুসজল ভালোবাসায়। আনন্দ, বেদনা আর বিস্ময়ে ভেসে ওঠে সেই মুহূর্ত।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জাহানারা মৃত তমিজ উদ্দিনের মেয়ে। ছোটবেলায় রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। দীর্ঘদিন খোঁজাখুঁজির পরও কোনো সন্ধান না পেয়ে একসময় পরিবার ধরে নেয়, তিনি আর বেঁচে নেই।

গত শনিবার গভীর রাতে ছেলেকে নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছান জাহানারা। তাঁর ছেলে মানজিদার সিং (৩০)। প্রথমে তিনি জগন্নাথপুর ইউনিয়নের পীরবাড়ি গ্রামে তার বোনের বাড়িতে ওঠেন। পরে রোববার সকাল ১০টার দিকে নিজ গ্রাম শাহাপাড়ায় যান।

জাহানারাকে দেখতে সকাল থেকেই গ্রামে ভিড় করেন শত শত মানুষ। কেউ একনজর দেখতে, কেউ কথা বলতে, আবার কেউ পুরোনো স্মৃতির গল্প শুনতে ভিড় জমান। পুরো গ্রাম যেন পরিণত হয় এক মানবিক মিলনমেলায়।

জাহানারার ভাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, প্রায় ৪০ বছর আগে পাশের বাড়ির ফখদুল নামে এক ভাতিজা কৌশলে আমার বোনকে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়। আমরা তখন কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। অনেক খুঁজেছি, কিন্তু কোনো খোঁজ পাইনি। আজ মনে হচ্ছে আল্লাহ নিজেই তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন।

আরেক ভাই বলেন, শৈশবের সেই মুখ আজও ভুলিনি। এত বছর পরও এক মুহূর্তে চিনে ফেলেছি। মনে হচ্ছে সময় থমকে গেছে।

ভাতিজি সুমাইয়া আক্তার বলেন, ছোটবেলা থেকে ফুপুকে নিয়ে গল্প শুনেছি। কখনো ভাবিনি সামনে দেখব। আজ তাকে জড়িয়ে ধরে মনে হয়েছে, হারানো জীবনের একটা অংশ ফিরে পেয়েছি।

প্রতিবেশী আবদুল করিম বলেন, আজ পুরো গ্রাম আনন্দে মেতেছে। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও একটা কষ্ট আছে—একজন মানুষ এত বছর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন, এটা ভাবতেই কষ্ট লাগে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ভারতে গিয়ে জাহানারা নতুন পরিচয়ে জীবন শুরু করেন। পাঞ্জাবের তাংতারা এলাকায় বিয়ে করে বর্তমানে চার সন্তানের জননী তিনি। তাঁর সংসার এখন ভারতে হলেও, শিকড় টানলেই তিনি ফিরে এসেছেন নিজের জন্মভিটায়।

জাহানারা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমি কখনো ভাবিনি আবার এই বাড়িতে ফিরতে পারব। আমার শৈশব, আমার পরিবার—সবকিছু আজ চোখের সামনে।

তার ছেলে মানজিদার সিং বলেন, মায়ের মুখে সবসময় গ্রামের কথা শুনেছি। আজ সেই জায়গায় এসে আমি খুবই আবেগাপ্লুত।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকেলে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখান থেকে আবার ভারতে ফিরে যাবেন। বিদায়ের কথা উঠতেই আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা।

গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দার ভাষায়, এমন দৃশ্য জীবনে খুব কমই দেখা যায়। আজ আনন্দ আছে, আবার বিদায়ের বেদনাও আছে।

প্রতিনিধি/ এজে