images

শিক্ষা / সারাদেশ

তারুণদের চোখে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস, স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রত্যাশা

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

০৩ মে ২০২৬, ১০:৫২ এএম

‘শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন: মানবাধিকার উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার’ এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্বজুড়ে আজ পালিত হচ্ছে মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে প্রতিবছর নতুন করে সামনে আসে দিনটি।

সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। এই নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে দেখা গেছে ভিন্নধর্মী ভাবনা ও প্রত্যাশা। বিশেষ করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন ও স্বাধীন সাংবাদিকতা নিয়ে। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মূল ভিত্তিই হলো স্বাধীন গণমাধ্যম। তবে বাস্তবতায় নানা চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সরকারদলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা তার নিরপেক্ষতা হারায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জিহাদ হোসেন বলেন, আমরা এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা থাকবে না। তরুণ সমাজের কণ্ঠও সেখানে গুরুত্ব পাবে। ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহ যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তির ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই স্বাধীন সাংবাদিকতার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতাও জরুরি।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হান আহমেদের মতে, আমরা সাংবাদিকতা বলতে কী বুঝি—যে ব্যক্তি নিরপেক্ষভাবে তথ্য প্রচার করবে, যার মধ্যে কারো স্বার্থ সংরক্ষিত হবে না, সত্য ব্যতীত। কিন্তু বর্তমানে তা দেখা যায় না। এর বড় কারণ হলো, যেসব সংবাদমাধ্যম সংবাদ প্রচার করে, তাদের মালিকানা থাকে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও বড় ব্যবসায়ীদের কাছে। তাদের কেউ কেউ এর মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। যার ফলে, সাংবাদিকতার সঠিক ব্যবহার হয়ে ওঠে না।

রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মিরাজ হোসেন বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। মিডিয়া স্বাধীন না হলে সমাজের মাফিয়া শ্রেণির লোকেরা সমাজ ও রাষ্ট্রকে শোষণ করার সুযোগ পেয়ে যায়। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রকৃত স্বাধীনতা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে গণমাধ্যমকে আরও গতিশীল ও বহুমাত্রিক করা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মমিন সরকার বলেন, অনেক সময় সাংবাদিকরা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না মালিকপক্ষ এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে। মাঝে মধ্যেই এই সীমাবদ্ধতাগুলোকে প্রত্যক্ষ করতে হয়। সাংবাদিকদের জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে। প্রথমত, আইন সংস্কারের মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে; নিরাপত্তা, প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা, মিডিয়া মালিকানার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাংবাদিকতা পেশা সম্পূর্ণ স্বাধীন না হলে ভবিষ্যতে এ পেশা হুমকির মুখে পড়বে। গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরও নিচে নেমে যাবে। তাই সরকারের উচিত দেশজুড়ে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক মো. খাদেমুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম পুরোপুরি স্বাধীন নয়। কারণ এর ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ থাকে; এ চাপগুলোকে ওভারকাম করে স্বাধীনভাবে কাজ করা অনেক কঠিন। বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখনো ওই পর্যায়ে যায়নি যে, তাকে আমরা স্বাধীন বা মুক্ত বলতে পারি। সাংবাদিকদের অবস্থাও তেমন একটা ভালো নয়। কোনো একটি রিপোর্ট করতে গেলে অনেক সময় দেখা যায় যে, তাদেরকে পেশিশক্তির মুখোমুখি হতে হয়। নানান ধরনের ভয়ভীতি তাদেরকে দেখানো হয়। এগুলোকে ওভারকাম করতে যে প্রোটেকশন দরকার, তা সাংবাদিকরা অনেক সময় পায় না।

 

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য সরকারের আইন করা দরকার, যেগুলো সাংবাদিকদের কর্মক্ষেত্রে প্রোটেকশন দেবে। সাংবাদিকদের চাকরির নিশ্চয়তা, তাদের ভালো বেতনের ব্যবস্থা, সাংবাদিকতা পেশাকে যথাযথ সম্মান দেওয়া—এগুলোর জন্য সরকারের আইন করা দরকার। এগুলো অনেক ক্ষেত্রে করা হয় না, ফলে সাংবাদিকরা সবসময় একধরনের প্রেশারের মধ্যে থাকে।

প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ অধিবেশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ৩ মে-কে ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম’ দিবসের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর থেকেই বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমকর্মীরা দিবসটি পালন করে আসছেন। দিবসটিতে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করার শপথ নেওয়ার পাশাপাশি ত্যাগী সাংবাদিকদের স্মরণ ও তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো হয়।

প্রতিনিধি/টিবি