জেলা প্রতিনিধি
০১ মে ২০২৬, ১০:০৫ পিএম
শ্রমিকদের নেই ছুটি, প্রযুক্তিগত কারণ দেখাচ্ছে কর্তৃপক্ষ
মে দিবসে যখন দেশের অধিকাংশ কলকারখানায় ছুটি, র্যালি ও শ্রমিক সমাবেশে ব্যস্ত সময় কাটছে, তখনও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পিএইচপি ফ্যামিলির কাচ কারখানায় পুরোদমে চলেছে উৎপাদন। ২১ বছর ধরে দিন-রাত অবিরাম চালু থাকা এ কারখানায় মে দিবসেও ছুটি পাননি শ্রমিক-কর্মচারীরা।
কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রযুক্তিগত কারণে এ কারখানা বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। একবার উৎপাদন বন্ধ হলে পুনরায় চালু করতে দেড় বছর পর্যন্ত সময় এবং প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। তবে শ্রমিকদের একাংশ বলছেন, প্রযুক্তিগত জটিলতার কথা বলা হলেও মূল লক্ষ্য মুনাফা ধরে রাখা।
কারখানার কয়েকজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে শুক্রবার-শনিবার কিংবা সরকারি ছুটি বলে কিছু নেই। ঈদ, পূজা কিংবা মে দিবসেও তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় কাজ করলেও সে তুলনায় বেতন ও সুযোগ-সুবিধা কম।
তাঁরা আরও বলেন, অতীতে কারখানা একবার বন্ধ হয়েছিল। তাই চাইলে কর্তৃপক্ষ উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে পারে। প্রযুক্তিগত কারণকে তাঁরা ‘অজুহাত’ হিসেবে দেখছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন সোহেল। তিনি বলেন, কাচ উৎপাদনের প্রযুক্তি অন্য শিল্পকারখানার মতো নয়। এ ধরনের কারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়া একবার চালু হলে তা অব্যাহত রাখতে হয়।
তিনি জানান, কাঁচ তৈরিতে লাইমস্টোন, সিলিকন বালু, সোডা অ্যাশ, সল্ট কেক, ডোলোমাইট ও কয়লার গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। এসব উপাদান গলাতে প্রায় ১ হাজার ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়। কোনো কারণে উৎপাদন বন্ধ হলে ফার্নেসের ভেতরের গলিত উপাদান জমাট বেঁধে লোহার মতো শক্ত হয়ে যায়।
আমির হোসেন সোহেল বলেন, ২০১৮ সালে ‘কোল্ড রিপেয়ারিং’ বা ‘ক্যাম্পেইন’-এর জন্য একবার কারখানা বন্ধ করতে হয়েছিল। পরে তা পুনরায় চালু করতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময় লাগে। জমাট বাঁধা অংশ কাটতে প্রায় ছয় মাস এবং অন্যান্য মেরামতে আরও প্রায় এক বছর সময় লাগে। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়।
তিনি আরও বলেন, কারখানাটি সচল রাখতে বিকল্প বিদ্যুৎ, জেনারেটর, মোটর ও গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একটি মোটরের বিপরীতে তিনটি বিকল্প মোটর রাখা হয়। কারণ, কয়েক মিনিটের জন্যও উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

প্রতিদিন ৩০০ টন উৎপাদনক্ষম এ কারখানায় তিন শিফটে প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক কাজ করেন। প্রায় ৩০ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা কারখানাটি নির্মাণে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
মে দিবসে শ্রমিকদের কাজ করানোর বিষয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকেরা সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ছুটির আর্থিক সুবিধা পান। মে দিবসের মতো কোনো ছুটির দিনের জন্য অতিরিক্ত ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়।
এদিকে মে দিবসে কারখানা চালু রাখার বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি) চট্টগ্রামের সভাপতি তপন দত্ত। তিনি বলেন, মে দিবস মূলত শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রতীকী দিন। ঐতিহ্যগতভাবে এ দিনে কলকারখানা বন্ধ রেখে শ্রমিকেরা র্যালি, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
তবে তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর কিছু শিল্পে উৎপাদনব্যবস্থা বদলে গেছে। যদি কোনো কারণে মে দিবসেও কারখানা চালু রাখতে হয়, তাহলে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের বাড়তি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড এলাকায় ২০০৫ সালের ২৩ জুন পিএইচপির এ কাঁচ কারখানা চালু হয়। কারখানাটিতে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ টন কাঁচ উৎপাদিত হচ্ছে।
এআর