জেলা প্রতিনিধি
০১ মে ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম
ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনায় ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বর্তমানে জেলার কংস নদের পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ১২ মিটার এবং উপদাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া সোমেশ্বরী, ধনু, মগড়া ও মহাদেওসহ সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
শুক্রবার (১ মে) বিকেল ৩টার দিকে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, গত বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি, মদন, আটপাড়া, কেন্দুয়া, সদর ও বারহাট্টাসহ বিভিন্ন উপজেলার ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়। তবে গতকাল সকাল থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় পানি আর বাড়েনি। কৃষকেরা এখন বেশ কিছু জমির ধান কাটার চেষ্টা করছেন। তবে এখনো ৮ হাজার ৫৩৪ হেক্টর জমির ধান পানির নিচেই রয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বাস্তবে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ সরকারি হিসাবের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
কৃষি বিভাগ, পাউবো ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে জেলার হাওরাঞ্চলসহ নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। জেলায় এবার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়, যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হাওরে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে, যার মধ্যে শুধু খালিয়াজুরীতেই রয়েছে ৪ হাজার ৯৮৫ হেক্টর।
হাওরের ফসল রক্ষায় এ বছর ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। বাঁধের কারণে এখন পর্যন্ত পাহাড়ি ঢলের পানি হাওরে সরাসরি প্রবেশ না করলেও অতিবৃষ্টির জমাটবদ্ধ পানিতেই এ বিপত্তি ঘটেছে।
খালিয়াজুরীর জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টির পানি বের হওয়ার পথ না থাকায় জলাবদ্ধতায় ধান তলিয়ে গেছে। হাওরের অধিকাংশ স্লুইসগেট অকেজো। নদী, নালা ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নামতে পারছে না। হাওরে এখনো অর্ধেক ধান কাটা বাকি, এর ওপর গবাদিপশুর খড়ও শুকানো যাচ্ছে না।’
মোহনগঞ্জের তেতুলিয়া গ্রামের কৃষক জামাল মিয়া জানান, ডিঙাপোতা হাওরে তার ২০ একর জমির মধ্যে মাত্র ৬ একরের ধান কাটতে পেরেছেন, বাকি সব পানির নিচে। একই গ্রামের কৃষক সাইদুর মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘১০ একরের মধ্যে মাত্র ৩ একর কাটতে পেরেছি। বাকি ধান সব নষ্ট হয়ে গেছে। খড় শুকাতে পারছি না, এখন গরুগুলো বিক্রি করা ছাড়া আর পথ নেই।’
খালিয়াজুরি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৫২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। পানি আরও বাড়লে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। মদন ও কলমাকান্দা উপজেলাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমির ধান এখন পানির নিচে। মদনের কৃষক নয়ন মিয়া জানান, ২ হাজার টাকা মজুরি দিয়েও ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বেড়িবাঁধগুলো এখনো সুরক্ষিত আছে। তবে বৃষ্টির পানি বের হতে না পারায় এই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।’

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, হাওরের বিভিন্ন নালা, খাল ও নদ-নদীতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। তবে নতুন করে পানি না বাড়লে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রতিনিধি/একেবি