images

সারাদেশ

কালবৈশাখীর ঝড়ে বড় ধাক্কা: ৬৮ হাজার একর লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত

জেলা প্রতিনিধি

০১ মে ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম

কালবৈশাখীর ঝড় ও টানা ভারি বর্ষণে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলে লবণ শিল্পে নেমে এসেছে বড় ধাক্কা। গত দুই দিনের বৈরী আবহাওয়ায় অন্তত ৬৮ হাজার একর লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিতে লবণ মাঠের উৎপাদিত লবণ গলে যাওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হয়েছে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা ‘বেড’ বা ‘কাই’। ফলে উপকূলজুড়ে আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে লবণ উৎপাদন কার্যক্রম।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) জানায়, চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ১২ দিনের বৃষ্টিতে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন কম হয়েছে। তবে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করছেন তারা।

8d80344b-4047-4e42-abe8-d68efd198e0c

মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে তীব্র দাবদাহের কারণে লবণ উৎপাদন বাড়তে শুরু করেছিল। দৈনিক উৎপাদন ১২ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে এক পর্যায়ে ৩২ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছায়, যা ছিল চলতি মৌসুমের রেকর্ড। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে কালবৈশাখীর আঘাতে উৎপাদনের সেই ধারায় ছেদ পড়ে।

কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের লবণ চাষি আলমগীর হোসেন জানান, ১২ একর জমিতে চাষ করা তার প্রায় দেড় হাজার মণ লবণ বৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে।

একইভাবে, শাহেদ সেলিম নামের আরেক চাষি বলেন, তার ১২ কানি জমির মধ্যে সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে প্রায় ৩০০ মণ লবণ পানিতে ভেসে গেছে।

76c9d883-8879-4c53-9a49-bd77daae20b7

লবণ চাষি আহমেদ হোসেনের দাবি, মাত্র দুই দিনের বৃষ্টিতে ৫ একর মাঠ তছনছ হয়ে গেছে। অন্তত ৩০০ মণ লবণ নষ্ট হয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি বাজারে কম দামের কারণে চাষিদের লোকসান আরও বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়, যেখানে উৎপাদন খরচই পড়ছে প্রায় ৩০০ টাকা।

চাষি ফরিদ উল্লাহ বলেন, প্রতি কেজি লবণ উৎপাদনে ১০ টাকার বেশি খরচ হলেও বিক্রি করতে হচ্ছে ৫ টাকারও কম দামে। এতে আমরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।

নোয়াপাড়ার চাষি গিয়াস উদ্দিনের ভাষায়, চার মাস ধরে লোকসান দিয়ে লবণ বিক্রি করছি। দাদনের টাকা শোধ তো দূরের কথা, সংসার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।

7155a452-66da-406e-b100-f3f6bfa3cc0b

টেকনাফের হোয়াইক্যং, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকার লবণ মাঠে উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি থমকে গেছে। অনেক মাঠে নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে অন্তত ৭ থেকে ৮ দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।

স্থানীয় লবণ ব্যবসায়ীরা জানান, উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে টেকনাফে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ জড়িত। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে তাদের জীবিকায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় হঠাৎ বৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বাড়ছে, যা লবণ শিল্পের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে টেকসই অবকাঠামো, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করলে প্রান্তিক চাষিরা ক্রমেই এই পেশা থেকে সরে যেতে পারেন।

1503870c-188e-47bd-be2f-32633bd8ddb0

টেকনাফ সাবরাং লবণ চাষি কল্যাণ ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফরিদ আহম্মদ অভিযোগ করেন, সংকটের অজুহাতে একটি সিন্ডিকেট লবণ আমদানির চেষ্টা করছে। আমদানি শুরু হলে প্রান্তিক চাষিরা আরও বিপদে পড়বে।

কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভুঁইয়া বলেন, বৃষ্টিতে সব লবণ পুরোপুরি নষ্ট হয় না। তবে উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। টানা অনুকূল আবহাওয়া থাকলে ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।

d0a1b978-d2b9-4fe5-b481-649ce9b97c6e

চলতি মৌসুমে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে উৎপাদন হয়েছে ১৭ লাখ ৫৯ হাজার মেট্রিক টন, আর আগের মৌসুমের ৪ লাখ মেট্রিক টন মজুত রয়েছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বর্তমান বৈরী আবহাওয়া আরও ২-৩ দিন থাকতে পারে। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে ৬ মে থেকে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা যাবে। ১৪ মে থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হতে পারে, যা ১০-১৫ দিন স্থায়ী হতে পারে, এটি লবণ উৎপাদনের জন্য সহায়ক হবে।

প্রতিনিধি/এসএস