জেলা প্রতিনিধি
২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৭ এএম
জ্বালানি সংকট ও তাপপ্রবাহের মধ্যে ভ্যাপসা গরমে চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে বেড়েছে ঘন ঘন লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় গড়ে ৩৫ থেকে ৪৬ শতাংশ বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
গ্রীষ্ম মৌসুম এলেই দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার তালিকায় থাকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা চুয়াডাঙ্গা। বর্তমানে তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র লোডশেডিং, সব মিলিয়ে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম অস্বস্তি।
শহর থেকে গ্রাম, সব জায়গাতেই একই চিত্র। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে-রাতে ১২ থেকে ১৫ বার, কোথাও কোথাও তারও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে মাত্র ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন তারা।

সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা এমনকি গভীর রাতেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট অব্যাহত থাকায় জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশনার কারণে ব্যবসা আগেই সীমিত হয়ে গেছে। তার ওপর দিনভর লোডশেডিংয়ে ক্রেতা কমে যাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে।
এদিকে চলতি বছর চুয়াডাঙ্গায় ১১ হাজার ৭৬৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। সামনে রয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে তাদের পড়ালেখা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, পড়তে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। তীব্র গরমের মধ্যে পড়া ঠিকমতো রিভিশন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে শিশু ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর। রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ঘুম। অনেকে বাধ্য হয়ে বাড়ির বাইরে সময় কাটাচ্ছেন, কিন্তু মশার উপদ্রবে সেখানে থাকাও কষ্টকর হয়ে উঠছে। এতে বিভিন্ন রোগব্যাধির ঝুঁকিও বাড়ছে।

কৃষকরাও পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়। ইরি-বোরো ধান কাটার সময় ঘনিয়ে এলেও সেচ সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, পাশাপাশি ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে সেচযন্ত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন গ্রামীণ এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে গ্যাস ও কয়লার ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ৩০ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
চুয়াডাঙ্গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে দুটি সংস্থা, শহর এলাকায় ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এবং গ্রামীণ এলাকায় মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় জেলায় গ্রাহক সংখ্যা ৫ লাখ ১৯ হাজার ৭৬৪। একটি ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড ও ১২টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে এসব গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

পল্লী বিদ্যুৎ সূত্র জানায়, চলতি মাসে তাদের চাহিদা ১৪২ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে অনেক কম। চলতি সপ্তাহে ১৪২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৯২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ওজোপাডিকোর অধীনে চুয়াডাঙ্গায় প্রায় ৫০ হাজার গ্রাহক রয়েছে। এখানেও লোডশেডিং রয়েছে, তবে পল্লী বিদ্যুতের তুলনায় কিছুটা কম। ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠা না গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
চুয়াডাঙ্গা জোনাল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, তাদের জোনে মোট গ্রাহক সংখ্যা ৮৪ হাজার। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৭৪ হাজার। চাহিদা ২০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৩ মেগাওয়াট, যার ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিনিধি/এসএস