জেলা প্রতিনিধি
২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩২ পিএম
বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী করতোয়া নদী এখন যেন দূষণের এক ভয়াবহ প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বাসাবাড়ি, বাজারঘাট, সরকারি-বেসরকারি অফিসআদালত থেকে শুরু করে পৌরসভার বর্জ্য সবকিছুরই শেষ গন্তব্য এখন এই নদী। এমনকি শৌচাগারের নালাও সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে নদীর সঙ্গে। এর ওপর যোগ হয়েছে মেডিকেলের বিষাক্ত বর্জ্য। পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, পানির মান এতটাই খারাপ হয়েছে যে, বর্ষার তিন মাস বাদে বছরের বাকি সময়ে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে।
শহরের ফতেহ আলী বাজার ও রাজা বাজার এলাকায় দূষণের চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য জমা হলেও সেগুলো ফেলার সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে ব্যবসায়ীরা সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলছেন। বিশেষ করে পশু জবাইয়ের পর অবশিষ্টাংশ নদীতে ফেলার কারণে দূষণ আরও তীব্র হচ্ছে। রাজা বাজার আড়তদার ও সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, ‘বগুড়া বড় শহর হওয়ায় প্রচুর বর্জ্য তৈরি হয়। কিন্তু ফেলার পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে নদীতে ফেলছেন।’
নদী তীরের বগুড়া জেলা কারাগারের বর্জ্যও সরাসরি ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জেল সুপার বলেন, ‘এটি শুধু কারাগারের সমস্যা নয়; পুরো শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’
এদিকে, করতোয়া দখল ও দূষণের অভিযোগে বারবার বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএস-এর নাম উঠে আসছে। পরিবেশবাদীদের দাবি, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, বর্জ্য ফেলে ভরাট এবং কারখানার বর্জ্য ফেলার মাধ্যমে নদী ধ্বংস করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে টিএমএসএস। তাদের দাবি, তারা ১৯৯৫ সালে সরকারের কাছ থেকে ৯৯ বছরের জন্য ৪ দশমিক ৯০ একর জমি ইজারা নিয়েছে এবং নদী দখলের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

২০১৯ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পরিদর্শনে করতোয়ার বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ দখল ও দূষণের চিত্র উঠে আসে। কমিশন জেলা প্রশাসককে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ময়লা ফেলা বন্ধ, অবৈধ বালু উত্তোলন রোধ এবং কৃত্রিম বাঁধ বা আইল্যান্ড অপসারণের নির্দেশ দেয়। চিঠিতে টিএমএসএস-এর বিরুদ্ধে নদীর জায়গা দখলের বিষয়টিরও উল্লেখ ছিল।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বগুড়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, ‘প্রশাসন ছোট দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও বড়দের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না।’
২০১৫ সালে হাইকোর্ট করতোয়া নদীতে বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করলেও বাস্তবে তা থমকে আছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা বলেন, ‘দূষণ রোধে বিভিন্ন স্থানে সাইনবোর্ড লাগানো হলেও ডাস্টবিন স্থাপন করলে সেগুলো চুরি হয়ে যায়। ৩০০ কোটি টাকার একটি পানি শোধনাগার প্রকল্প ছিল, যা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।’
আইন অনুযায়ী, নদী দখল বা দূষণের দায়ে ২০২০ সালের খসড়া আইনে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। তবুও দিনদুপুরে চলছে দূষণের মহোৎসব।
বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স অবস্থানে আছি। কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন ও আইনি নির্দেশনা থাকার পরও কেন থামছে না করতোয়ার এই মরণদশা? এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই নদী অচিরেই শুধুই ইতিহাস হয়ে থাকবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।