images

সারাদেশ

দিনাজপুরে টমেটোর বাম্পার ফলন, পরিবহনের চড়া ভাড়ায় ফিকে ব্যবসায়িদের হাসি

জেলা প্রতিনিধি

২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম

ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই দিনাজপুরের গর্ভেশ্বরী নদীর তীরজুড়ে শুরু হয় লাল টমেটোর এক ব্যস্ত সকাল। একের পর এক খাঁচাভর্তি টমেটো নিয়ে কৃষকেরা যখন গাবুড়া বাজারে ভিড় করেন, তখন মুহূর্তেই পুরো এলাকা সরগরম হয়ে ওঠে এক জীবন্ত অর্থনীতির কেন্দ্রে।

কৃষক ও পাইকারের হাঁকডাক আর শ্রমিকদের নিরন্তর ছুটে চলায় দিনাজপুর সদর উপজেলার এই বাজারটি এখন শুধু একটি স্থানীয় হাট নয়, বরং উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ কৃষিপণ্য বিপণনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। 

দিনাজপুর-চিরিরবন্দর সড়কের কোল ঘেঁষে মাস্তান বাজার পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য অস্থায়ী আড়ত আর রাস্তার ধারের ছোট ছোট জটলা প্রমাণ করে, এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে টমেটো এখন কতটা প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে। তবে এই কর্মব্যস্ততার আড়ালে দানা বাঁধছে এক গভীর সংকট; জ্বালানি তেলের সংকটে পণ্যবাহী ট্রাকের দুষ্পাপ্যতা আর মাত্রাতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া এখন ব্যবসায়ীদের পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে দেয়ালের সাথে।

ভোর থেকেই কেউ ভ্যানে, কেউ মোটরসাইকেলে, আবার কেউ কাঁধে করে নিজের ক্ষেতের সতেজ ফলন নিয়ে বাজারে আসেন। বাজারে ঢুকতেই শুরু হয় দরদাম; টমেটোর আকার, রং ও গুণগত মান দেখে ঠিক হয় দাম। এই বাজারে শুধু স্থানীয় ব্যবসায়ীরাই নন, বরং ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ফেনী, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শতাধিক পাইকার ভিড় করছেন। 

আড়তগুলোতে এখন ১০ থেকে ৩০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে, যারা বাছাই থেকে শুরু করে ক্যারেটে ভরা এবং ট্রাকে মাল তোলার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নেপথ্যে থাকা ব্যবসায়ীরা এখন বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন।

dinajpur-dhaka-mail

শরীয়তপুর থেকে আসা পাইকার দবির সরদার তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে জানান, চলতি বছরে মূলত কৃষকরাই বেশি লাভবান হচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা এখান থেকে তুলনামূলক বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছি, কিন্তু ঢাকার বাজারে গিয়ে সেগুলো প্রত্যাশিত দামে বিক্রি করা যাচ্ছে না। ফলে ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখছেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রে লোকসানের মুখে পড়ছেন।’ 

তার মতে, পরিবহন সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বাজারে সহজে পণ্যবাহী গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না, আর যা পাওয়া যাচ্ছে তার ভাড়াও আকাশচুম্বী। এই বাড়তি খরচ ব্যবসায়ীদের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

বিপরীতে, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মাঝে বইছে আনন্দের জোয়ার। সদর উপজেলার নয়নপুর এলাকার কৃষক নাজমুল হুদা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন ও দাম দুটোই সন্তোষজনক। তিনি বলেন, ‘আজ আমি প্রতি মণ টমেটো ১ হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি করেছি।’ একই ধরনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন চাকার এলাকার কৃষক মোয়াজ্জেম হোসেন; তিনি ১ হাজার ১৫ টাকা দরে নিজের টমেটো বিক্রি করতে পেরে বর্তমান বাজারদরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। বর্তমানে বাজারে বিপুল প্লাস ও বিউটি জাতের টমেটো প্রতি মণ ১ হাজার টাকায় এবং আনসাল জাতের টমেটো ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানও এই অঞ্চলের টমেটো অর্থনীতির এক বিশাল সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরে জেলায় ৮৬৫ হেক্টর জমিতে ৩৬ হাজার ১৮ মেট্রিক টন টমেটো উৎপাদিত হয়েছিল। এবার সেই পরিধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৮ হেক্টর জমিতে, যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৬ হাজার ১৩৭ মেট্রিক টন। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (শস্য) মো. আনিছুজ্জামান বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার ফলেই এবার চাষাবাদের জমির পরিমাণ বেড়েছে। আমরা আশা করছি, প্রতি হেক্টরে গড়ে ৪১ দশমিক ৬৪ টন উৎপাদন হবে।’

dinajpur-tomoto-2

তিনি আরও জানান যে, বর্তমানে ফসল উত্তোলন কার্যক্রম পুরোদমে চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৯০০ হেক্টর জমির ফসল উত্তোলন সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট জমির ফসল ধাপে ধাপে মাঠ থেকে তোলা হচ্ছে। কৃষি বিভাগ সবসময় কৃষকদের পাশে আছে উল্লেখ করে তিনি আগামীতে আরও ভালো ফলাফল অর্জনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তবে দিনশেষে মাঠের বাম্পার ফলন আর বাজারের এই বিপুল কর্মতৎপরতা তখনই সার্থক হবে, যখন পরিবহন খাতের অস্থিরতা কাটিয়ে ব্যবসায়ীরাও স্থিতিশীলতার মুখ দেখবেন। অন্যথায়, অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ চাকাটি বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন হতে পারে।

প্রতিনিধি/একেবি