২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৬ এএম
২০২০ সালে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পর থেকে ফেনীতে প্রতি বছরই কমছে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা। ২০২২ সালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষায় ফেনীতে ৩৭ হাজার ৮৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নিলেও সেই সংখ্যা ক্রমেই নিম্নমুখী হয়ে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৯ জনে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে ফেনীতে এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার্থী কমেছে ১৪ হাজার ৯৯৬ জন।
জেলায় দিনদিন জনসংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিম্নমুখী হওয়ায় তা সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলছে। কোভিডকালীন শিক্ষার্থী অনুপস্থিতির ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না পারায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন পর্যন্ত নিম্নমুখী রয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে অনেকেই বলছেন, করোনার সময় দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা শিশুশ্রম ও অন্যান্য পেশায় জড়িয়ে পড়ে। পরে স্কুল চালু হলেও তাদের প্রতিষ্ঠানে ফেরানোর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ওই সময়ে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ব্যাচ এখন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফেনীতে অন্তত ২৫ হাজার শিক্ষার্থী স্থায়ীভাবে স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে বলে তথ্য উঠে আসার পরও প্রশাসন নীরব ভূমিকায় থাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যায় উর্ধ্বমুখিতা সৃষ্টি করা যায়নি। পাঁচ বছরের মাথায় পরীক্ষার্থীর নিম্নমুখিতার সূচক দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ৪৩ শতাংশে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ২০২২ সালে ফেনীতে এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার্থী ছিল ৩৭ হাজার ৮৫ জন। কিন্তু ২০২৩ সালে প্রায় ১৩ হাজার পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৪ হাজার ৬০০ জনে। এরপর থেকে শিক্ষার্থীর নিম্নমুখিতা জেলাকে আঁকড়ে ধরে। ২০২৪ সালে জেলায় ২৪ হাজার ৫৫৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। ২০২৫ সালে অংশ নেয় ২৩ হাজার ৬০৯ জন। যা চলতি বছরে নেমে এসেছে ২২ হাজার ৮৯ জনে।
বছরের পর বছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিম্নমুখী হওয়ায় জেলায় শিক্ষার হারেও নিম্নমুখিতা সৃষ্টি হচ্ছে কি-না, তা সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলছে।
জেলার সচেতন মহল বলছে, করোনার পর প্রকাশিত প্রতিবেদনের আলোকে শিক্ষা বিভাগ অথবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যদি শিক্ষা বিভাগ অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতো, তাহলে জেলায় শিক্ষার্থী ঝরে যাওয়ার হার অনেক কমে যেত।
জেলা প্রশাসন জানায়, এবার ফেনীর ৩৬টি কেন্দ্রে সর্বমোট ২২ হাজার ৮৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। তাদের মধ্যে এসএসসিতে ১৪ হাজার ৯৪৩ জন, দাখিলে ৫ হাজার ৯৭৭ জন এবং এসএসসি ও দাখিল ভোকেশনালে ১ হাজার ১৬৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের রুটিন অনুযায়ী পরীক্ষা চলবে ২০ মে পর্যন্ত। আর মাদ্রাসা বোর্ডের পরীক্ষা শেষ হবে ২৪ মে।
ফেনীতে দিনদিন পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে ফেনী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফী উল্লাহ বলেন, ‘প্রবাসীউন্মাদ ফেনীতে শিক্ষার্থীদের এসএসসি পাস করানোর আগেই প্রবাসে পাঠানোর প্রস্তুতি হিসেবে কর্মে নিয়োজিত করেন অভিভাবকরা। এর একটি বড় প্রভাব পরীক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর পড়েছে। তাছাড়া এখন যারা এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে তারা করোনাকালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছিল। করোনার পর স্কুল খোলা হলেও শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ অনুপস্থিত হয়ে পড়ে। অনেকেই শিক্ষাজীবনের ইতি টানে। এতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যায়। যার প্রভাব এখন পর্যন্ত পরীক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর রয়ে গেছে।’
নানা কারণে ফেনীতে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে পারে বলে মনে করেন ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক। তিনি বলেন, ‘করোনা মহামারীকালে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। সেই ঝরে পড়ার হারের প্রভাব এখন পর্যন্ত রয়ে গেছে। এ ছাড়াও ফেনীতে আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা, কওমি অথবা নুরানি মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের ঝোঁক এবং অভিভাবকদের মধ্যে প্রবাসমুখিতা থাকায় ফেনীতে দিনদিন পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে পারে।’
ফেনীতে পরীক্ষার্থী কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার হার কমে যাচ্ছে কি-না তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।
প্রতিনিধি/এমআই