২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম
একই দিনে জন্ম, একই ছন্দে বেড়ে ওঠা; আর এবার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এসএসসি-তেও একসঙ্গে অংশ নিচ্ছে তিন বোন।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর গ্রামের স্বপ্নীল বর্মন, স্বর্ণালী বর্মন ও সেঁজুতি বর্মন ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর একসঙ্গে জন্মগ্রহণ করে। ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হওয়া ও পড়াশোনা করা এই তিন বোন মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
তাদের বাবা ঠান্ডারাম বর্মন ও মা ময়না রানী সেন। চার সন্তানের এই পরিবারে বড় মেয়ে মৃদুলা বর্মন ও ছোট ছেলে প্রদ্যুৎ বর্মনের পাশাপাশি এই তিন বোনই পরিবারের মূল আকর্ষণ।
সোমবার তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনজনই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। পড়ার টেবিলে পাশাপাশি বসে মনোযোগ দিয়ে পড়ছে তারা লক্ষ্য একটাই, ভালো ফল করে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করা।
তিন বোন জানায়, ছোটবেলা থেকেই তারা একসঙ্গে পড়াশোনা করছে। প্রথমে একটি কিন্ডারগার্টেনে এবং পরে স্থানীয় আরাজী কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে তারা। সেখানে শিক্ষক ও সহপাঠীদের পক্ষে তাদের আলাদা করে চেনা বেশ কঠিন ছিল।
২০১৮ সালে স্বপ্নীল ও স্বর্ণালী ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়; পরে একই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় সেঁজুতিও। তিনজনই একই শিফটে পড়লেও স্বর্ণালীকে আলাদা শাখায় পড়তে হয়েছে। এবার তারা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
পড়াশোনায় তিনজনই মনোযোগী এবং বরাবরই ভালো ফল করে আসছে। তবে পছন্দের বিষয়ে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে-স্বপ্নীলের প্রিয় জীববিজ্ঞান ও বাংলা সাহিত্য, স্বর্ণালীর জীববিজ্ঞান ও রসায়ন এবং সেঁজুতির পছন্দ জীববিজ্ঞান। খাবারের ক্ষেত্রে তিনজনেরই প্রিয় বিরিয়ানি, যদিও অন্যান্য খাবারে ভিন্নতা আছে। পোশাকের ক্ষেত্রে আগে একই পছন্দ থাকলেও এখন রুচিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। থ্রি-পিস তাদের সবার প্রিয় এবং বিশেষ আয়োজনে তারা শাড়ি পরতে ভালোবাসে।
পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তারা সক্রিয়। তিনজনই বাংলাদেশ বেতার, ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত শিশুশিল্পী এবং দেশাত্মবোধক গান গাইতে পছন্দ করে। অবসর সময়ে উপন্যাস ও সায়েন্স ফিকশন বই পড়া এবং গান শোনা ও গাওয়া তাদের প্রিয় শখ।
ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের স্বপ্ন ভিন্ন ভিন্ন। স্বপ্নীল চায় বিসিএস ক্যাডার হতে, স্বর্ণালীর লক্ষ্য চিকিৎসক হওয়া এবং সেঁজুতি শিক্ষক হতে চায়।
তাদের জীবনযাপনও অনেকটা একসুতোয় গাঁথা একই ঘরে থাকা, একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা ও খেলাধুলা। ছোটখাটো খুনসুটি বা ঝগড়া হলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না, মুহূর্তেই মিল হয়ে যায়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাপস দেবনাথ জানান, একই ইউনিফর্মে তাদের আলাদা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে যেত, তাই চেনার জন্য মাঝে মাঝে বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করতে হতো।
মা ময়না রানী সেন বলেন, ‘একসঙ্গে তিন মেয়েকে বড় করা সহজ ছিল না, তবে তাদের ভালোবাসা সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।’
বাবা ঠান্ডারাম বর্মন বলেন, প্রথমে যমজ সন্তান হবে ভেবেছিলেন, কিন্তু তিন মেয়ে হওয়ায় কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তবে এখন তাদের সাফল্যে তিনি গর্ব অনুভব করেন এবং তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে চান।
তিন বোনই সবার দোয়া প্রার্থী, যেন তারা ভালো ফল করে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে।
প্রতিনিধি/একেবি