images

সারাদেশ

নাগলিঙ্গমে নীরব বিস্ময়, প্রকৃতির অপূর্ব শিল্পভাষ্য

জেলা প্রতিনিধি

১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২০ পিএম

নাগলিঙ্গমের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতিপ্রেমী দ্বিজেন শর্মা তার ‘শ্যামলী নিসর্গ’ গ্রন্থে লিখেছিলেন ‘আপনি বর্ণে, গন্ধে, বিন্যাসে অবশ্যই মুগ্ধ হবেন। এমন আশ্চর্য ভোরের একটি মনোহর অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই অনেক দিন আপনার মনে থাকবে।’

সত্যিই, নাগলিঙ্গম যেন প্রকৃতির এক নীরব বিস্ময়। বিরল এই বৃক্ষের ফুল শুধু সুন্দরই নয়, এর গঠন ও বিন্যাসও বিস্ময় জাগানিয়া। যেখানে অধিকাংশ গাছের ফুল শাখায় ফোটে, সেখানে নাগলিঙ্গম ফুটে ওঠে সরাসরি গাছের কাণ্ডজুড়ে। যেন কাণ্ড ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে শত শত ফুলের সারি। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কেউ যেন নিপুণ হাতে গাছের গায়ে ফুল গেঁথে সাজিয়ে রেখেছে।

চায়ের দেশ মৌলভীবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে এই গাছ যোগ করেছে নতুন মাত্রা। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল এখন নাগলিঙ্গমের রূপে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে শ্রীমঙ্গলের দুটি স্থানে এই বিরল গাছে ফুল ও ফল ধরেছে। এর একটি বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) ক্যাম্পাসে, অন্যটি মির্জাপুর ইউনিয়নের শহরশ্রী গ্রামে অবসরপ্রাপ্ত নৌ-কর্মকর্তা দেওয়ান গউছউদ্দিন আহমদের বাড়িতে।

এই দুই স্থানেই গাছগুলো এখন রঙ, গন্ধ আর বিস্ময়ের এক অপূর্ব সমাহার। নাগলিঙ্গম শুধু সৌন্দর্যে নয়, বৈজ্ঞানিক ও ঔষধি গুরুত্বেও অনন্য। লম্বা গাছের কাণ্ডজুড়ে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা নয়নাভিরাম ফুল আর তার তীব্র সুগন্ধের আকর্ষণে প্রতিদিন ভিড় করছেন বৃক্ষপ্রেমীরা।

গবেষকদের মতে, এ বৃক্ষ থেকে তৈরি ওষুধ পেটের পীড়ায় ব্যবহৃত হয়। এক একটি বৃক্ষ লম্বায় প্রায় ১১০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। দ্রুতবর্ধনশীল হওয়ায় চারা রোপণের প্রায় ১২ থেকে ১৩ বছরের মধ্যেই ফুল আসতে শুরু করে। এর পাতাও বেশ চমৎকার; গুচ্ছবদ্ধ গাঢ় সবুজ পাতাগুলো সাধারণত ৮ থেকে ৩১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। অন্যান্য বৃক্ষের মতো বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নাগলিঙ্গমের পাতা ঝরে পড়ে। তখন বৃক্ষটির কাণ্ড পুরোপুরি অনাবৃত হয়ে যায়।

জনশ্রুতি রয়েছে, এক সময় দেশের বিভিন্ন এলাকার জমিদাররা তাঁদের বাড়িতে এই বৃক্ষ রোপণ করতেন; কারণ এর ফল ছিল হাতির অত্যন্ত প্রিয় খাবার।

জানা যায়, ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার আব্দুল্লাহ আল হোসেন বিটিআরআই ক্যাম্পাসে গাছটির চারা রোপণ করেন। তিন দশকে এটি বিশাল আকৃতি ধারণ করেছে। অন্যদিকে, শহরশ্রী গ্রামের একটি বাড়ির আঙিনাতেও একই দৃশ্য। গাছের গোড়া থেকে কাণ্ডজুড়ে ফুটে থাকা ফুলের আধিক্যে সেখানে পাতাই প্রায় দেখা যায় না।

স্কুলছাত্রী মেহজাবিন আক্তার বলে, ‘ফুলগুলো দেখতে অনেকটা সাপের ফণার মতো। দেখে একটু ভয় লাগলেও খুব সুন্দর লাগে।’ সিলেট থেকে আসা পর্যটক নুসরাত জাহান বলেন, ‘এই ফুলের সুবাস একেবারে আলাদা, যা দূর থেকেই টের পাওয়া যায়। এমন সুন্দর ও সুগন্ধি ফুল আমি আগে দেখিনি; যেন প্রকৃতির এক নীরব শিল্পকাব্য।’

বাপার (বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলে এমন বিরল গাছ আছে তা অনেকেই জানেন না। প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এই গাছগুলো সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।’

দেওয়ান গউছউদ্দিন আহমদ জানান, প্রায় ৬০ বছর আগে তার বড় ভাই নার্সারি থেকে একটি চারা এনে বাড়িতে রোপণ করেন। তখন এটি কী গাছ তা তারা জানতেন না। ধীরে ধীরে গাছটি বড় হয়ে ফুল দেওয়ার পর এর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ইসমাইল হোসেন জানান, নাগলিঙ্গমের আদি নিবাস মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার রেইন ফরেস্ট এলাকা। বাংলাদেশে এটি প্রায় বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ। এই গাছের ফুল, পাতা, ফল ও বাকলের নির্যাস থেকে বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরি হয়।

Naglingam-DM

প্রকৃতিপ্রেমী দ্বিজেন শর্মার মতে, নাগলিঙ্গমে সারা বছর ফুল ফুটলেও গ্রীষ্মকাল হচ্ছে উপযুক্ত সময়। শীত ও শরৎকালে তুলনামূলক কম ফুল ফোটে। গাঢ় গোলাপি ও হালকা হলুদের মিশ্রণে ছয় পাপড়ির এই ফুল দেখতে অনেকটা সাপের ফণার মতো হওয়ায় এর নাম হয়েছে 'নাগলিঙ্গম'। দিন বা রাত—যে কোনো সময় এই গাছের পাশ দিয়ে গেলে এর তীব্র সুগন্ধ যে কাউকে মুগ্ধ করবেই।

প্রতিনিধি/একেবি