জেলা প্রতিনিধি
১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২২ এএম
জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে অনেকেই ভেঙে পড়েন, কেউবা হার মানেন নিয়তির কাছে। কিন্তু শরীয়তপুরের জসিম উদ্দিন বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পথ—ভালোবাসা, সাহস আর আত্মত্যাগের পথ। কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া স্ত্রীর জন্য যখন মিলছিল না কোনো ডোনার, তখন নিজেই এগিয়ে এসে নিজের একটি কিডনি দিয়ে নতুন জীবন উপহার দিলেন তিনি।
এই মানবিক ঘটনাটি এখন শরীয়তপুরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অনেকেই বলছেন, এটি শুধু একটি চিকিৎসা সফলতার গল্প নয়, বরং দাম্পত্য ভালোবাসার এক গভীর, বাস্তব ও অনন্য প্রতিচ্ছবি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে উচ্চ রক্তচাপসহ নানা জটিলতায় অসুস্থ হয়ে পড়েন ৩২ বছর বয়সী মিনারা বেগম। শুরুতে সাধারণ অসুস্থতা মনে হলেও ধীরে ধীরে পরিস্থিতি জটিল হতে থাকে। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, তার দুটি কিডনিই অকার্যকর হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ধরা পড়ে পেটে একটি টিউমার।
_20260417_092053909.jpg)
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা সংগ্রাম। টিউমারের চিকিৎসা কোনোভাবে সম্পন্ন হলেও কিডনি প্রতিস্থাপন হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রয়োজন ছিল একজন উপযুক্ত ডোনারের। পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে মিনারার মা এগিয়ে এলেও পরীক্ষায় তার হৃদরোগ ধরা পড়ায় সেই আশাও ভেঙে যায়।
নিরাশার এই সময়েই দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন স্বামী জসিম উদ্দিন (৩৬)। কোনো দ্বিধা না করে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে নিজের কিডনি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে গত ৫ মার্চ ঢাকার শ্যামলীর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে তার একটি কিডনি মিনারার শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়।
অস্ত্রোপচারের পর এখন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন মিনারা বেগম। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ঢাকার শ্যামলীতে ভাড়া বাসায় দিন কাটছে তাদের। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশায় এগিয়ে চলছেন তারা।
জসিম-মিনারার দাম্পত্য জীবনের শুরু ২০০৭ সালে। শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের বসকাঠি গ্রামের এই দম্পতির সংসারে একমাত্র সন্তান তামিম আল মারুফ। ঢাকায় একটি চাকরির মাধ্যমে সংসার চালাতেন জসিম। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও ২০২৪ সালের শুরুতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন মিনারা। সেই থেকেই শুরু হয় অনিশ্চয়তার লড়াই।
মুঠোফোনে মিনারা বেগম বলেন, যখন জানতে পারি আমার দুই কিডনিই নষ্ট, তখন মনে হয়েছিল সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। টাকার অভাব, ডোনার না পাওয়া—সব মিলিয়ে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। আমার মা কিডনি দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটাও সম্ভব হয়নি। তখন আমার স্বামীই এগিয়ে আসেন। আমি তাকে অনেকবার নিষেধ করেছি, কিন্তু তিনি একটুও পিছপা হননি।
তিনি আরও বলেন, তিনি বলেছিলেন—বাঁচলে একসঙ্গে বাঁচব, আর মরলেও একসঙ্গে মরব। তার এই ভালোবাসা আমাকে নতুন করে বাঁচার সাহস দিয়েছে।

অন্যদিকে জসিম উদ্দিন বলেন, স্ত্রীর এমন অবস্থায় বসে থাকার সুযোগ ছিল না। মনে হয়েছে, তাকে বাঁচাতে যা দরকার, তাই করতে হবে। নিজের ইচ্ছাতেই কিডনি দিয়েছি। এখন তাকে ধীরে ধীরে সুস্থ হতে দেখে সব কষ্ট ভুলে যাচ্ছি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই ঘটনাকে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। কুচাইপট্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম নাসির উদ্দিন স্বপন বলেন, এটি শুধু একটি পারিবারিক ঘটনা নয়, বরং সমাজের জন্য একটি বড় শিক্ষা। জসিম উদ্দিনের এই আত্মত্যাগ সত্যিই অনুকরণীয়।
ভালোবাসা অনেক সময় শব্দে প্রকাশ করা যায় না, তা প্রমাণিত হয় কাজে। জসিম উদ্দিনের এই সিদ্ধান্ত শুধু তার স্ত্রীর জীবনই বাঁচায়নি, বরং আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে—মানবিকতা, দায়িত্ববোধ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রতিনিধি/এসএস