images

সারাদেশ

বিদায় অনুষ্ঠানে গিয়ে ফেরেনি শিক্ষার্থী, খোঁজ মিলল স্কুলের কক্ষে

জেলা প্রতিনিধি

১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০১ পিএম

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের ছত্রগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান শেষে নিখোঁজ হওয়া ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ৮ ঘণ্টা পর বিদ্যালয়ের তিন তলার একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকাল ৯টায় স্কুলে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর রাত ৮টার দিকে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয়রা। 

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সকালে বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে স্কুলে যায় ওই ছাত্রী। অনুষ্ঠান শেষ হলেও সে বাড়িতে না ফেরায় স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কোথাও না পেয়ে রাত ৮টার দিকে তারা বিদ্যালয়ের পিয়ন হামিদুলের কাছে চাবি চাইলে তিনি চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং বিদ্যালয়ে কেউ নেই বলে দাবি করেন। এ সময় ছাত্রীর মামা মো. নাজিমের সঙ্গে পিয়ানের বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে চাবি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে বিদ্যালয়ের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে মেয়েটিকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন গ্রামবাসী।

নিখোঁজ ছাত্রীর মামা মো. নাজিম ঘটনাটি সম্পর্কে বলেন, আহত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ছাত্রী আমার বড় বোনের মেয়ে। ঘটনার দিন মেয়েটি স্কুলে গেলেও পরে আর বাড়িতে ফিরে আসেনি। বিষয়টি জানতে পেরে পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পায়নি।

পরবর্তীতে আমরা বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, বিদ্যালয়ের চাবি দপ্তরী হামিদুল ইসলামের কাছে থাকে। এরপর আমি নিজে দপ্তরীর কাছে গিয়ে চাবি চাইলে দপ্তরী চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় দপ্তরির সাথে বাকবিতণ্ডা হয় এবং দপ্তরি আমাকে ধাক্কাধাক্কি করে বলেন, ‘তুমি কি আমার বাড়িতে মদ খেয়ে ঢুকেছো? পরবর্তীতে স্কুল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কক্ষ খোলা হলে দেখা যায়, মেয়েটি স্কুলের ভেতরেই ছিল এবং সেখান থেকেই তাকে উদ্ধার করা হয়।

মেয়েটির মুখ বাঁধা ছিল কিনা এ বিষয়ে তিনি বলেন, উদ্ধারের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না, তাই এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারি না। তবে যারা মেয়েটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে, তাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তখন মেয়েটি অচেতন অবস্থায় ছিল এবং কথা বলতে পারছিল না। বর্তমানে সে চিকিৎসাধীন রয়েছে।


আইনি পদক্ষেপ প্রসঙ্গে মো. নাজিম বলেন, আমার ভাতিজা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেছিল। পরে পুলিশ এসে ঘটনাস্থলে তদন্ত করে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে বিস্তারিতভাবে যোগাযোগ করেননি। 

ছত্রগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ খাইরুজ্জামান বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার রাগী চৌধুরী। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানটি শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। অনুষ্ঠান শেষে তারা বাড়ী চলে যান।

প্রধান শিক্ষক বলেন, সন্ধ্যার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী আমার বাড়িতে গিয়ে জানায়, একটি মেয়ে নিখোঁজ রয়েছে। তখন আমি তাদের বিদ্যালয়ে গিয়ে খোঁজ নেওয়ার জন্য দপ্তরির কাছ থেকে চাবি নিতে বলি। শিক্ষার্থীরা প্রথমবার খুঁজে না পেলেও পরবর্তীতে আবার খোঁজ করতে গিয়ে দপ্তরির ৩য় তলায় একটি স্থানে মেয়েটিকে দেখতে পায়। তখন সে কিছুটা বসা ও কিছুটা শোয়া অবস্থায় ছিল এবং তার জ্ঞান কিছুটা অস্পষ্ট মনে হচ্ছিল। খবর পেয়ে আমি নিজেও সেখানে যাই এবং মেয়েটিকে পাশের একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন চিকিৎসক এসে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে পরিবারের সদস্যরা এসে তাকে নিয়ে যান।

সিসিটিভি ফুটেজ সম্পর্কে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানের সময় বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির কক্ষে অন্য কোনো শিক্ষার্থী ছিল না। ওই মেয়েটি একা প্রায় ৭-৮ মিনিটের জন্য কক্ষে প্রবেশ করে এবং পরে নিজের ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যায়। এরপর সে ক্যামেরার বাইরে চলে যায় এবং তার পরবর্তী গতিবিধি আর দেখা যায়নি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজে অন্য কাউকে ওই এলাকায় প্রবেশ করতে দেখেনি। এছাড়াও রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি, কিন্তু মেয়েটির বের হয়ে যাওয়ার পর আর কাউকে ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।

তিনি বলেন, পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসেছে এবং দফতরির এলাকায় গিয়ে কিছু প্রাথমিক অনুসন্ধান ও কথাবার্তা বলেছে।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল আজিজ বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে জানায়, তাকে কেউ ধাক্কা দেয়নি এবং তার সঙ্গে অন্য কেউ কোনো কিছু করেনি। তবে সে প্রচণ্ড ব্যথার কথা জানিয়েছে। বিষয়টি চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনো কারণে হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত হতে তাকে রাতে সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে এখনো কোনো আপডেট পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ধর্ষণ বা এ ধরনের কোনো ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মেয়েটি কীভাবে পড়ে গিয়েছিল বা কী কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়েও এখনো কিছু জানা যায়নি। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পরিবার থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি।

প্রতিনিধি/ এজে