জেলা প্রতিনিধি
০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম
তিলে তিলে গড়া স্বপ্নের কারখানা মুহূর্তেই ছাই হয়ে গেছে। আগুন শুধু একটি ঘরই পোড়ায়নি পুড়িয়ে দিয়েছে এক উদ্যোক্তার স্বপ্ন, দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ আর একটি অসহায় পরিবারের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকুও।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বাইশমৌজা বাজারে একটি টিনশেড ঘরে ‘দিক এন্ড ব্রাদার্স সু ফ্যাক্টরি’ গড়ে তুলেছিলেন হরিজন সম্প্রদায়ের সংগ্রামী মানুষ মনো মানিক রবি দাস। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম আর অগণিত ত্যাগের বিনিময়ে গড়া এই ছোট কারখানাটিই ছিল তার পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস। দিন-রাত এক করে জুতা তৈরির এই ব্যবসাকে ঘিরেই তিনি বুনেছিলেন আগামীর সব আশা।
সামনে পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা বছরের সবচেয়ে বড় বিক্রির মৌসুম। সেই লক্ষ্যেই বিপুল পরিমাণ জুতা তৈরি করে মজুত করেছিলেন তিনি। পরিকল্পনা ছিল বিক্রির লভ্যাংশ দিয়ে ঋণের বোঝা কমানো, সংসারে স্বস্তি আনা এবং দুই ছেলের পড়াশোনা নিশ্চিত করা।
কিন্তু গত ৯ মার্চ রাতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় তার সব পরিকল্পনা। ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই আগুন গ্রাস করে নেয় প্রস্তুতকৃত জুতা, কাঁচামাল ও সব যন্ত্রপাতি। চোখের সামনে নিজের তিল তিল করে গড়া স্বপ্ন ভস্মীভূত হতে দেখেন তিনি। এখন সেখানে কেবল পড়ে আছে পোড়া টিন আর ছাইয়ের স্তূপ।
ঘটনার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেলেও এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারটি বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। মনো মানিকের দুই ছেলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অর্জুন রবি দাস (দিক) এবং পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রনক রবি দাস (ছোটন)-এর পড়াশোনাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
জানা গেছে, কারখানাটি স্থাপনের জন্য তিনি এনজিও, ব্যাংক ও স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে মোটা অংকের ঋণ নিয়েছিলেন। আগুনে সব হারিয়ে এখন সেই ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা, নিত্যদিনের অন্নসংস্থান করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
কারখানার মালিক মনো মানিক রবি দাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন ‘অনেক কষ্টে এই কারখানাটা দাঁড় করিয়েছিলাম। ঈদের বাজার ধরার জন্য সব জুতা তৈরি ছিল। কিন্তু আগুনে আমার ২৬ লক্ষ টাকার মালামালসহ সব শেষ হয়ে গেছে। এখন কীভাবে ঋণ শোধ করব আর কীভাবে সংসার চালাব কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।’
তিনি জানান, পুনর্বাসন সহায়তার আশায় নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত আবেদন করেছেন।
এ বিষয়ে নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘তার আবেদনটি জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে পাঠানো হয়েছে। এটি কোনো নাশকতা নয়, বরং একটি হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।’
স্থানীয়দের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত এই পরিবারটিকে দ্রুত সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
একসময় যে হাতে জুতা তৈরি করে পরিবারের স্বপ্ন বুনতেন মনো মানিক, আজ সেই হাত অসহায়। তবুও বুকভরা আশা নিয়ে তিনি তাকিয়ে আছেন নতুন কোনো ভোরের দিকে। ঈদুল আজহার আগে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পেলে হয়তো আবারও ঘুরবে কারখানার চাকা, স্কুলে ফিরবে দুই শিশু। এখন দেখার বিষয় মানবিকতার হাত কি আদৌ পৌঁছাবে এই নিঃস্ব পরিবারটির কাছে? নাকি আগুনে পোড়া স্বপ্নই হয়ে থাকবে মনো মানিকের জীবনের শেষ গল্প।
প্রতিনিধি/একেবি