জেলা প্রতিনিধি
০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম
বিগত ২০২৪ সালে বন্যার সময় ঘরে পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে যায় ঘরের মালামালসহ অন্যান্য সামগ্রী। এরপর গত ২ বছর ধরে হাফিজুর রহমান দিনরাত পরিশ্রম করে তিল তিল করে নিজের সংসারটি গুছিয়ে আনছিলেন। তৈরি করেছিলেন নতুন বসতভিটা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই বন্যার ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই এবারের কালবৈশাখি ঝড়ে তার মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁইটুকুও কেড়ে নিল।
ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার (৬ এপ্রিল) দিবাগত গভীর রাতে ১৫ নং শরিফপুর ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের জলিল মিয়ার বাড়ির বাসিন্দা হাফিজুর রহমানের বসতভিটায়। রাতে তার নতুন ঘরের উপর কালবৈশাখির ঝড়ে গাছ পড়ে সম্পূর্ণ ঘরটি মাটিতে চাপা পড়ে যায়।

হাফিজুর রহমান পেশা একজন ওয়ার্ড কমিউনিটি হেলথ এর CHCP (Community Health Care Provider) এর তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। ১ বছর আগে বাবাকে হারিয়েছেন, বর্তমানে বৃদ্ধা মা তার সঙ্গেই থাকেন। বাবা মারা যাওয়ার পর ৬ ভাই ও ৩ বোন সবাই নিজ নিজ সংসার নিয়ে আলাদা থাকেন। দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে তার ছোট সংসার কোনোভাবে চালিয়ে নেন হাফিজুর রহমান। ইচ্ছা ছিল কয়দিন পর নতুন ঘরে উঠবেন কিন্তু কালবৈশাখির ঝড়ে তার আর নতুন ঘরে উঠা হলো না।
হাফিজুর রহমান জানান, ২০২৪ বন্যার সময় আমার ঘরটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এরপর আমি দুই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নতুন ঘরটি তৈরি করে আসছি। যদিও আমরা পুরাতন ঘরটিতে বসবাস করছি। আর কিছুদিন পর নতুন ঘরে আমাদের ওঠার কথা ছিল, কিন্তু গতকাল রাতে কালবৈশাখি ঝড়ে গাছ পড়ে আমার সেই ঘরটি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়।
তিনি জানান, নতুন ঘরটি আমাদের পুরাতন ঘর থেকে একটু দূরে। রাতে আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে আমি ফজরের নামাজের পর হাঁটতে বের হওয়ার সময় দেখি গাছ পড়ে ঘরটি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে মাটিতে মিশে যায়। আমি এ ঘর করার জন্য সোনালি ব্যাংক থেকে ২ লাখ টাকা ও একটি বাড়ি, একটি খামার প্রকল্প থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিই। কিন্তু ঋণ পরিশোধ করার আগেই আমার ঘরটি এখন আবারও বিধ্বস্ত হয়ে যায়। যে চাকরি করি তা দিয়ে কোনোরকম সংসার চলে। তার উপর আবার ঋণের বোঝা। এখন নতুন করে আবার ঘর নির্মাণ করতে আমার জন্য কঠিন হয়ে যাবে।
স্থানীয় প্রতিবেশী মোহাম্মদ শরীফ জানান, হাফিজুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে এ এই ঘরটি তৈরি করে আসছেন। তিনি স্থানীয় একটি ওয়ার্ড হেলথ ক্লিনিকে চাকরি করেন। ওই টাকা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। বাকি টাকা দিয়ে ঘরটি তৈরি করছিলেন। কিন্তু রাতে কালবৈশাখি ঝরে তার নতুন এ ঘরটি গাছ পড়ে মাটির সাথে চাপা পড়ে যায়। কিছুদিন পর তারা এই ঘরটিতে ওঠার কথা ছিল। তার সম্পদ বলতে শুধু এই বসতভিটা টুকুই। চোখের সামনে ঘরটার এ অবস্থা দেখে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।

এ বিষয়ে বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কায়েসুর রহমানের সাথে কথা বললে তিনি জানান, এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগী যদি আবেদন করে সে ক্ষেত্রে আমাদের একটি তদন্ত টিম পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা মিললে সেক্ষেত্রে সরকারি যে সহযোগিতা রয়েছে তাকে সে সহযোগিতা করা যেতে পারে।
বর্তমানে তার একমাত্র সম্পদ বলতে আছে কেবল বসতভিটাটুকু। মাথার ওপর ঋণের বোঝা, আর চোখের সামনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া নিজের ঘর— সব মিলিয়ে হাফিজুর রহমান এখন দিশেহারা। নিজের সন্তানদের নিরাপদ ছাদ দেওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি গত কয়েক বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন, তা এখন কালবৈশাখির ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। সরকারি সহায়তা বা সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা ছাড়া, এই ঋণের জাল থেকে বেরিয়ে পুনরায় ঘর তোলা হাফিজুর রহমানের জন্য এক পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিনিধি/এসএস