জেলা প্রতিনিধি
০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৯ এএম
রাজবাড়ী জেলার দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে এখন কেবলই হলুদের সমারোহ। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই বাতাসের তালে দোল খাচ্ছে সূর্যমুখী ফুল।
চলতি ২০২৫-২০২৬ সনের রবি মৌসুমে জেলায় সূর্যমুখীর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ভালো ফলন হওয়ায় খুশির ঝিলিক দেখা দিয়েছে স্থানীয় কৃষকদের চোখেমুখে। স্বল্প খরচে লাভজনক হওয়ায় সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন জেলার কয়েক হাজার কৃষক, যা জেলার সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজবাড়ী জেলায় মোট ৫৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২০ হেক্টর,পাংশা উপজেলায় ১০ হেক্টর, বালিয়াকান্দি উপজেলায় ১০ হেক্টর, গোয়ালন্দ উপজেলায় ১০ হেক্টর, কালুখালী উপজেলায় ৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমূখী চাষ করেছেন চাষিরা।
আরও পড়ুন
সরজমিনে দেখা গেছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং পরিমিত সেচ ও সারের ব্যবহারের ফলে প্রতিটি গাছেই বড় আকারের ফুল এসেছে।
কৃষকরা বলছেন, সরকারিভাবে বিনামূল্যে উচ্চফলনশীল বীজ ও সার পাওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ অনেক কমেছে। এছাড়া কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরামর্শ ও আধুনিক কৃষি পদ্ধতির প্রয়োগ ফলন বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
কৃষকরা জানিয়েছেন, প্রতি একর জমিতে সূর্যমুখীর ২০ থেকে ২৪ মণ ফলন হয়। এর থেকে তেল পাওয়া যায় প্রায় ১২ মণ। সূর্যমুখীর তেল ছাড়াও খৈল দিয়ে মাছের খাবার এবং গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ার মূল কারণ এর উচ্চ বাজারমূল্য ও বহুমুখী ব্যবহার।
ধান বা অন্য ফসলের তুলনায় সূর্যমুখীতে খাটুনি কম কিন্তু মুনাফা বেশি। উৎপাদিত সূর্যমুখী থেকে প্রাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত ভোজ্যতেল পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এছাড়া সূর্যমুখীর খৈল পশুখাদ্য হিসেবে এবং শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে কৃষকরা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার চাষি মো. রফিকুল ইসলাম এ বছর ২ বিঘা জমিতে সূর্যমূখী চাষ করেছেন। তিনি বলেন, আগে এই জমিতে শুধু রবি শস্য করতাম, কিন্তু এবার কৃষি অফিসের পরামর্শে সূর্যমুখী লাগিয়েছি। ফলন দেখে আমি নিজেই অবাক! একেকটি ফুল যেন থালার মতো বড় হয়েছে। অন্য ফসলের চেয়ে এতে সেচ ও সার কম লাগে, অথচ লাভ অনেক বেশি। নিজের পরিবারের তেলের চাহিদা মিটিয়েও ভালো দামে বাজারে বীজ বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।
বালিয়াকান্দি উপজেলার চাষি স্বপন সোম বলেন, আমি এবং আমার স্ত্রী শখের বশে এক একর জমিতে সূর্যমুখী আবাদ শুরু করি। এখন আমাদের খেত দেখতে প্রতিদিন অনেক মানুষ ভিড় করছে। সূর্যমুখীর খৈল আমাদের গবাদি পশুর জন্য দারুণ পুষ্টিকর খাদ্য হবে। আগামী বছর এই চাষ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে।
পাংশা উপজেলার চাষি নজরুল মিয়া বলেন, বাজারে সয়াবিন তেলের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে সূর্যমুখী চাষ আমাদের জন্য আশীর্বাদ। এই গাছ অনেক শক্তপোক্ত হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ক্ষতি কম হয়। এছাড়া খেতের শুকনো গাছগুলো আমরা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারছি। লাভ আর বহুমুখী ব্যবহারের কারণে আমাদের এলাকার অনেক কৃষকই এখন সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জানান, রাজবাড়ীর মাটি ও জলবায়ু সূর্যমুখী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে সূর্যমুখী চাষ বড় ভূমিকা রাখছে। জেলার এই কৃষি সাফল্য স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি জেলার বেকার তরুণদেরও কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে অনুপ্রাণিত করছে।
তিনি আরও বলেন, মূলত সরকারের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচি এবং কৃষকদের সচেতনতাই এর প্রধান কারণ। আমরা এবার ৫৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ নিশ্চিত করেছি। কৃষকদের বিনামূল্যে উচ্চফলনশীল বীজ ও সার সরবরাহ করার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ দিয়েছেন। অনুকূল আবহাওয়াও আমাদের বড় সহায়তা করেছে। সয়াবিন তেলের আকাশচুম্বী দামের এই সময়ে সূর্যমুখী তেলের উৎপাদন আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দিচ্ছে। কৃষকরা তাদের নিজস্ব তেলের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত বীজ বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন। এছাড়া সূর্যমুখীর খৈল ও গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় এটি একটি বহুমুখী লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।
প্রতিনিধি/এসএস