images

সারাদেশ

চা বিক্রি করে দৈনিক ২৫ হাজার টাকা আয় সাইদুরের

জেলা প্রতিনিধি

০২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৮ পিএম

করোনাকাল, যখন পৃথিবীর অনেক মানুষের জীবন থমকে গিয়েছিল, তখনই সাইদুর ইসলামের জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। দিনাজপুরের একটি হোটেলে চাকরি করতেন তিনি। হঠাৎ করেই সেই চাকরি হারিয়ে ফেলেন। সামনে অনিশ্চয়তা, পরিবার চালানোর চাপ সব মিলিয়ে কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন সাইদুর। কিন্তু থেমে যাননি তিনি।

চাকরি হারানোর পর নিজের ওপর ভরসা রেখে ছোট পরিসরে শুরু করেন একটি চায়ের দোকান। শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ। একাই সব কাজ করতেন তিনি। চা বানানো থেকে শুরু করে গ্রাহক সামলানো সব দায়িত্বই ছিল তার কাঁধে। ধীরে ধীরে সেই ছোট দোকানই হয়ে ওঠে তার নতুন স্বপ্নের ভিত্তি।

এই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি মজার ও হৃদয়ছোঁয়া অধ্যায়। ২০১০ সালে প্রথম দিনাজপুরে শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে এসে জায়গাটিকে তার এতটাই ভালো লেগে যায় যে আর ফিরে যাননি তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এলাকার মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠে এক আন্তরিক সম্পর্ক। স্থানীয়রা ভালোবেসে তাকে ‘জামাই’ বলে ডাকতে শুরু করে। সেই ভালোবাসাকে সম্মান জানিয়ে তিনি তার দোকানের নাম রাখেন— ‘জামাই টি ষ্টোল’। ছোট সেই উদ্যোগই আজ এক সফল ব্যবসার রূপ নিয়েছে।

বর্তমানে তার দোকানে প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার চা বিক্রি হয়। একসময় যে দোকানে তিনি একাই কাজ করতেন, সেখানে এখন কাজ করছেন ১২ জন কর্মচারী। যার মধ্যে রয়েছেন তার নিজের ছেলেও। এই ছোট ব্যবসা এখন শুধু তার জীবিকার উৎস নয় বরং অনেকের কর্মসংস্থানের মাধ্যম।

9595dba0-e924-4326-9bd6-046be07d7e7f

‘জামাই টি ষ্টোল’-এর আরেকটি বিশেষ দিক হলো এর বৈচিত্র্য। এখানে পাওয়া যায় প্রায় ১০ ধরনের চা— দুধ চা, মালাই চা, হরলিক্স চা, ডানো চা, স্পেশাল চা, লাল চা, ব্ল্যাক কফিসহ আরও নানা চা। প্রতিদিন এই দোকানে প্রায় ২০০ লিটার দুধ ব্যবহার হয়, যা এর জনপ্রিয়তা ও পরিসরকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রাকিব বলেন, আমি প্রায় প্রতিদিনই এখানে চা খেতে আসি। জামাইয়ের চায়ের স্বাদ সত্যিই অনন্য। বিশেষ করে মালাই চা আমার সবচেয়ে প্রিয়। এখানে একবার খেলে বারবার আসতে মন চায়।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিলি দাশ বলেন, আমি সাধারণত বাইরে খুব একটা চা খাই না, তবে মাঝে মাঝে এখানে আসি। জায়গাটি খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং সেবাও দারুণ। তাই বান্ধবীদের নিয়ে এখানে চা খেতে আসি।

চিরিরবন্দর থেকে আসা বিপ্লব বলেন, আমি বিভিন্ন জায়গায় চা খেয়েছি, কিন্তু এখানকার চায়ের স্বাদ আলাদা। শুধু চা নয়, জামাইয়ের ব্যবহারও অসাধারণ। তার আন্তরিক আচরণই মানুষকে বারবার এখানে টেনে আনে।

জামাই টি ষ্টোলের প্রতিষ্ঠাতা সাইদুর রহমান বলেন, করোনার সময় আমি এই স্টল শুরু করি। আমি প্রথমে একটি হোটেলে চাকরি করতাম, কিন্তু সেই সময় চাকরিটি হারাই। চাকরি চলে যাওয়ার পর আমি নিজেই এই চায়ের দোকান শুরু করি। বর্তমানে আমার দোকানে আমি ও আমার ছেলেসহ মোট ১২ জন কাজ করছি। এখন প্রতিদিন আমার দোকানে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার চা বিক্রি হয় এবং দৈনিক প্রায় ২০০ লিটার দুধের প্রয়োজন হয়।

 

সাইদুর রহমানের এই যাত্রা শুধু একটি ব্যবসার গল্প নয় এটি এক অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প, যেখানে পরাজয়কে তিনি সুযোগে রূপ দিয়েছেন।

আজ তিনি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী নন, তিনি একজন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী মানুষ। তার গল্প প্রমাণ করে জীবনে পথ বন্ধ হয়ে গেলেও নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব, যদি থাকে সাহস, পরিশ্রম আর অটল বিশ্বাস।

প্রতিনিধি/টিবি