images

সারাদেশ

‘আমার সাড়ে তিন বছরের বাচ্চাটা এতিম হয়ে গেছে’

জেলা প্রতিনিধি

২৯ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম

‘আমার সাড়ে তিন বছরের বাচ্চাটা এতিম হয়ে গেছে। আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই, সুষ্ঠু বিচার চাই আমি। নির্দোষ মানুষটাকে কেন হত্যা করল? যারা মারিছে আমি তাদের ফাঁসি চাই৷ কেন আমার ছোট বাচ্চাডারে এতিম করল?’

রোববার (২৯ মার্চ) দুপুরে নড়াইল সদর উপজেলার পেড়লি গ্রামে নিজবাড়িতে বসে কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা বলেন, নিহত নাহিদ সরদারের স্ত্রী আফিয়া বেগম।

এদিন রোববার দুপুরে নিহত নাহিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাকে হত্যা করা হয়েছে- এমন খবর পেয়ে বাড়িতে ভিড় করেছেন স্বজন ও স্থানীয়রা। শোকে কাতর সবাই। স্ত্রী আফিয়া খাতুন ও মা শিউলি বেগমসহ কয়েকজন নিকটাত্মীয় কাঁদছেন। সাড়ে তিন বছর বয়সী নাহিদের শিশু কন্যাটি ঘুমিয়ে আছে। তাঁদের চারপাশ ঘিরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন স্বজনরা।

bdfe8470-94b2-4864-921f-9423a4575ff4

এসময় কান্নারত কণ্ঠে নাহিদের মা শিউলি বেগম বলেন, ‘আমার বাবারে বিনা দুষি মারিছে, আমি এহন সুষ্ঠু বিচার চাই। আমার একটা বাচ্চা, আর কেউ নেই আমার। আমার বাজান কারো সাথে কোনো অপরাধ করে না৷ আমি আজকে কী করে ঘরের তলে মাথা দিবানিরে বাজান।’

এদিকে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট সহ বিভিন্ন সংস্থা নিজস্ব প্রক্রিয়ায় হত্যার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করে। রোববার দুপুরে ঘাতক ট্রাকটিকে (যশোর -ট-১১-৬০৪০) যশোরের বেনাপোল ট্রাক টার্মিনাল থেকে জব্দ করে নাভারন হাইওয়ে থানা পুলিশ। আর অভিযুক্ত ট্রাকচালক সুজাতকে একই দিন বিকেলে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার মাহমুদপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব- ৬ যশোর)।

এদিন সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব-৬ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর মেজর এটিএম ফজলে রাব্বি প্রিন্স জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি দায় হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।

cc03eafe-0bf5-49c7-84bd-f70ed01d516b

এর আগে, এদিন দুপুরে নিহত নাহিদের চাচা ও তানভীর ফিলিং স্টেশনের মালিক মো. রবিউল ইসলাম ট্রাক চালক সুজাত মোল্যাকে প্রধান অভিযুক্ত করে রোববার দুপুরে সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

নিহত নাহিদ সরদার পাশের গ্রাম তুলারামপুরে ঢাকা-বেনাপোল মহাসড়কের পাশে অবস্থিত তানভীর ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবার ও সহকর্মীদের অভিযোগ, গতকাল শনিবার মধ্যরাতে পাম্পে তেল না দেওয়াকে কেন্দ্র করে বাকবিতন্ডার পর নাহিদ সরদারকে ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করে ট্রাক চালক সুজাত মোল্যা। অভিযুক্ত সুজাতের বাড়িও নিহত নাহিদের গ্রামেই।

স্থানীয়রা জানায়, নাহিদদের পুরো পরিবার অত্যন্ত নম্র-ভদ্র। এলাকায় কারো সঙ্গে দ্বন্দ্ব নেই তাদের। অভিযুক্ত ট্রাক চালক সুজাত মোল্যার বাড়িও একই গ্রামে, নাহিদদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে। একই এলাকায় বাড়ি হলেও সুজাতের সঙ্গে নাহিদের পূর্বের কোনো বিরোধ ছিল না। তবে সুজাতকে খারাপ প্রকৃতির লোক হিসেবেই চেনে স্থানীয়রা। নাহিদের প্রশংসা করে কেউ কেউ বলেন, ‘এমন ছেলেকে হত্যা মেনে নেওয়া যায় না৷ এর কঠিন বিচার দরকার।’

নাহিদের পরিবার ও সহকর্মীদের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার রাত বারোটার দিকে নিজ কর্মস্থল তানভীর পাম্পে কাজ করছিলেন নাহিদ। আনুমানিক রাত বারোটার দিকে ট্রাক নিয়ে পাম্পে তেল আনতে যায় নাহিদের গ্রামের সুজাত। এসময় পাম্পে তেল না থাকায় সুজাতকে তেল দিতে অপরাগতা প্রকাশ করলে নাহিদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়।

67dd7e2e-9c28-4b60-b5e2-503878fd07ea

একপর্যায় ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাক চালক সুজাত প্রকাশ্যে নাহিদকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার হুমকি দেন। পরে রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে নাহিদ পাম্প থেকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার সময় ট্রাক নিয়ে ধাওয়া করে সুজাত। ফিলিং স্টেশন থেকে একটু সামনে ঢাকা-বেনাপোল মহাসড়কের ওপর নাহিদের মোটরসাইকেলকে ট্রাক চাপা দিয়ে পালিয়ে যায় সুজাত। এতে ঘটনাস্থলে নিহত হন নাহিদ। গুরুতর আহত হন তার মোটরসাইকেলে থাকা বন্ধু জিহাদুল মোল্যা। তিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক।

ওই রাতে পাম্পে থাকা কর্মী সোহান ইসলাম বলেন, ‘ম্যানেজার নাহিদ কাকাকে সুজাত বলেছিল, তুই তেল না দিলে, তোকে আজকে গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে দেব৷ তেল না থাকায় তাকে তেল দেওয়া হয়নি। কিন্তু ট্রাক নিয়ে সে পাম্পেই বসে ছিল। রাত দুইটা নয়ের দিক ম্যানেজার বাসার উদ্দেশে রওনা দিলে সুজাতও তার ট্রাক নিয়ে পেছনে যায়। তখন আমাদের কাছে খটকা লাগে। এগিয়ে যায়ে দেখি, সুজাত আমাদের ম্যানেজারের গাড়ির ওপর দিয়ে গাড়ি চালায় দিয়ে চলে গেছে। আমরা যেতে যেতে নাহিদ কাকা মারা যায়। আরেকজন ছিল, তার অবস্থা গুরুতর।’

আরও পড়ুন

ট্রাকচাপায় তেল পাম্পের ম্যানেজারকে হত্যা, অভিযুক্ত চালক গ্রেফতার

পাম্পের হিসাব রক্ষক জসিম উদ্দীন বলেন, ‘সুজাত ক্ষিপ্ত হয়ে নাহিদ কাকে বলছিল, তেল না তিলে তোরে ট্রাকের তলে দিয়ে মাইরে ফেলব। পরে সে (সুজাত) সেটাই করিছে, ট্রাকের তলে দিয়ে মাইরে ফেলিছে।’

এদিকে খবর পেয়ে রাতেই নাহিদের মরদেহটি উদ্ধার করে হাইওয়ে পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় নড়াইল জেলা হাসপাতালের মর্গে। দুপুর এটার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ হস্তান্তর করা হয় পরিবারের কাছে। দেড়টার দিকে নিজ গ্রামে পৌঁছায় নাহিদের নিথর দেহ। বিকেলে আছরের নামাজের পর জানাজা শেষে তাকে নিজ গ্রামে দাফন করা হয়।

এ ঘটনার প্রতিবাদে নড়াইল পাম্প মালিক সমিতি জেলার সব পেট্রোল পাম্প এক দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম হিট্রু এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, জেলার ১০টি পাম্প এ সিদ্ধান্তের আওতায় রয়েছে।

প্রতিনিধি/এসএস