জেলা প্রতিনিধি
২৮ মার্চ ২০২৬, ১১:৫৬ এএম
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় গরু লুটের সময় বাধা দেওয়ায় ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর পেটে লাথি মারার অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে। লাথির দোওয়ার পর পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হলে কিছুক্ষণের মধ্যে মৃত কন্যা সন্তান প্রসব করেন ওই নারী। পরে তাদের উদ্ধার করে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় পরিবার ও আশপাশের লোকজন।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে উপজেলার সুয়াইর ইউনিয়নের হাটনাইয়া আলীপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী গৃহবধূর নাম রোকেয়া আক্তার (৩৮)। তিনি উপজেলার হাটনাইয়া আলীপুর গ্রামের ওলিউল্লার স্ত্রী। আগামী এপ্রিল মাসের ১৫ তারিখ রোকেয়ার স্বাভাবিক ডেলিভারি হওয়ার কথা ছিল।
এ ঘটনায় শুক্রবার (২৭ মার্চ) বিকেলে ভুক্তভোগী নারীর স্বামী বাদী হয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
এতে একই গ্রামের আংগুর মিয়া (৩২), রফিকুল ইসলাম (৩৩), তরিকুল মিয়া (৩৫), আনসার মিয়া (২২) ও মজিবর মিয়াসহ (৫০) নয় জনের নামউল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ মার্চ ওলিউল্লার ভাগ্নের হাঁস নেমে আংগুর মিয়ার ডোবার পানি ঘোলা করাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। সংঘর্ষের সময় আংগুর মিয়ার লোকজন হাঁস লুট করে নিয়ে যায়। পরে এ ঘটনায় আংগুর মিয়ার পক্ষ থেকে করা মামলায় ওলিউল্লাহসহ তার পরিবার ও আত্মীয়দের আসামি করা হয়। এরপর থেকে ওলিউল্লার পরিবারের পুরুষ মানুষ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে থাকেন পুলিশের ভয়ে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে ওলিউল্লার বাড়িতে পুলিশ গিয়ে তাদের ধরতে অভিযান চালায়। কাউকে না পেয়ে পুলিশ চলে আসে। পরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে আংগুর মিয়াসহ ১৫-২০ জন ওলিউল্লার বাড়িতে হামলা চালায় এবং গরু লুট করার চেষ্টা করে। তবে পুরুষ মানুষ না থাকায় ওলিউল্লার ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রোকেয়া গরু লুটে তাদের বাধা দেয়। এসময় আংগুর মিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে রোকেয়ার পেটে লাথি মারে। অন্যরাও তাকে কিল ঘুঁষি মেরে আহত করে। ওই সময়ই পেটের তীব্র ব্যথায় চিৎকার শুরু করেন রোকেয়া। এতে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এর কয়েক ঘণ্টা পর মৃত সন্তান প্রসব করেন রোকেয়া। পরে মা ও নবজাতককে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নবজাতককে মৃত ঘোষণা করেন। আর রোকেয়াকে ভর্তি করে চিকিৎসা দেন।
ওলিউল্লাহ বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যা। আমি এর বিচার চাই। এরআগে ওরা আমাদের হাঁস লুট করেছে। পিটিয়ে জখম করে উল্টো মিথ্যা মামলায় আসামি করেছে। আমাদের পালিয়ে থাকার সুযোগে গভীর রাতে বাড়িতে গিয়ে হামলা করে গোয়ালের গরুগুলো লুট করতে গিয়েছে। বাধা দেওয়ায় আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর পেটে লাথি মেরে গর্ভের সন্তানকে হত্যা করেছে।
ভুক্তভোগী রোকেয়ার বড় বোন রুয়েলা আক্তার বলেন, গভীর রাতে বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায় আংগুর মিয়াসহ বেশ কয়েকজন। গেয়ালে গিয়ে গরুগুলো নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। বাড়িতে পুরুষ মানুষ না থাকায় রোকেয়া গিয়ে বাধা দেয়। এসময় তারা রোকেয়ার পেটে জোরে লাথি মারে এবং কিল ঘুঁষি দেয়। লাথি দেওয়ায় পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। এত রাতে আর তাকে হাসাপাতালে নিয়ে যেতে পারিনি, গাড়িও পাইনি। ভোরে প্রতিবেশী একজন ধাত্রীকে নিয়ে আসি। সকালে মৃত বাচ্চা প্রসব হয়। পরে মা ও নবজাতককে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসি। আগামী এপ্রিল মাসের ১৫ তারিখ স্বাভাবিক ডেলিভারি হওয়ার কথা ছিল রোকেয়ার। আমরা এর বিচার চাই।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মামুন মিয়া বলেন, আংগুর মিয়ার লোকজন বলছে ঘটনা মিথ্যা। আর ওলিউল্লাহর লোকজন বলছে ঘটনা সত্য। এই বিষয়টা নিয়ে এলাকায় দুইটা পক্ষ তৈরি হয়েছে। তাই প্রকৃত ঘটনা বোঝা যাচ্ছে না। পুলিশ তদন্ত করে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করবে আশা করছি।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আংগুর মিয়া বলেন, আগের একটি ঘটনায় আমার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ায় এলাকায় থাকি না। আগের ঘটনা ধামাচাপা দিতে এটি একটি সাজানো নাটক। আমাদেরকে ফাঁসাতেই এই নাটক সাজানো হচ্ছে।
আজ শনিবার (২৮ মার্চ) মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, খবর পেয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলমান রয়েছে।
প্রতিনিধি/টিবি