জেলা প্রতিনিধি
২৬ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৯ এএম
বরগুনা সদর উপজেলার ধূপতি মনসাতলী এলাকায় সামাজিক বনায়নের গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়ম, ভুয়া মেজারমেন্ট এবং পরিকল্পিতভাবে গাছের পরিমাণ কম দেখানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় উপকারভোগী, জমির মালিক ও এলাকাবাসীর দাবি বন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, বনায়ন সমিতির নেতৃবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ কাঠ গোপনে লোপাট করা হয়েছে। এতে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি প্রকৃত উপকারভোগীরাও বঞ্চিত হচ্ছেন।
জানা যায়, বরগুনা জেলার খাকধোন নদীর উত্তর পাড় ঘেঁষে মনসাতলী এলাকায় সুধাংশুর বাড়ি থেকে হোসেন শরীফের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪ হাজার ৮০০টি গাছের চারা রোপণ করা হয়। রেন্ট্রি, মেহগনি, শিশু, চাম্বল, অর্জুন, আকাশমনি, কড়ই, করমজা, খইয়াবাবলা, পিটালি, জাম, খয়ের ও জারুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিয়ে গড়ে ওঠে এই বাগান। এ প্রকল্পের সুবিধাভোগী হিসেবে স্থানীয় ৩২ জনকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার সভাপতি মো. আব্দুল আজিজ খান।

প্রচলিত সামাজিক বনায়ন নীতিমালা অনুযায়ী, এসব গাছ বিক্রির অর্থের ৬৫ শতাংশ উপকারভোগীদের পাওয়ার কথা। এছাড়া ১০ শতাংশ এনজিও, ১০ শতাংশ সরকারি কোষাগার এবং ৫ শতাংশ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের তহবিলে জমা হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে টেন্ডার প্রক্রিয়াকে ঘিরে ওঠা অভিযোগে স্থানীয়দের আশঙ্কা। প্রকৃত হিসাব গোপন করে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বন বিভাগের প্রস্তুত করা টেন্ডার শিডিউল অনুযায়ী বিক্রয়যোগ্য গাছের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৪৬৭টি, যার মোট কাঠের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩০৫৫ দশমিক ২৯ ঘনফুট। পাশাপাশি জ্বালানি কাঠ হিসেবে আরও প্রায় ১৪৬৯ ঘনফুট দেখানো হয়েছে। তবে এলাকাবাসীর দাবি, বাস্তবে গাছের সংখ্যা সিডিউলে উল্লিখিত সংখ্যার তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছ পরিমাপের সময় প্রতিটি গাছে গড়ে ১০ থেকে ১২ সিএফটি পর্যন্ত কাঠ কম দেখানো হয়েছে। ফলে সহস্রাধিক ঘনফুট কাঠ কম দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব ও উপকারভোগীদের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
এছাড়া আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, ৩৭৯ থেকে ৪০৩ নম্বর পর্যন্ত মোট ২৪টি মেহগনি গাছ পরিমাপ করা হলেও সেগুলো কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়াই অপসারণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, জনৈক মামুন খান নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে এসব গাছ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে কীভাবে এবং কার নির্দেশে এ গাছগুলো অপসারণ করা হয়েছে। সে বিষয়ে বনায়ন কমিটির সদস্যরাও স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
এছাড়া বন বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বজনরা এই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন। এসব অনিয়মকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। জমির প্রকৃত মালিকদের গাছ টেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় মালিকপক্ষ ও ঠিকাদারদের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় জালাল মোল্লা বলেন, মেজারমেন্টের সময় স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিগতভাবে রোপণ করা কিছু গাছেও নম্বর দিয়ে সেগুলোকে সামাজিক বনায়নের আওতায় দেখানো হয়েছে। আবার কেউ কেউ অর্থের বিনিময়ে নিজেদের গাছ তালিকা থেকে বাদ দিতে সক্ষম হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। যেসব মালিক অর্থ দিতে পারেননি, তাদের গাছ টেন্ডারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনার প্রতিবাদে বনায়ন কমিটির সদস্যদের পক্ষ থেকে পূর্ব ধূপতির বাসিন্দা মো. শানু খা বলেন, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও এখনো কোনো প্রতিকার মেলেনি। অভিযোগে টেন্ডার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে গাছের প্রকৃত মেজারমেন্ট পুনঃযাচাই, টেন্ডার ছাড়াই অপসারণ করা ২৪টি মেহগনি গাছের তদন্ত এবং পুরো প্রক্রিয়ার অনিয়ম খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও উপকারভোগীদের বঞ্চিত করার অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেন তিনি।

এ বিষয়ে বরগুনা বন বিভাগের রেঞ্জ সহকারী মো. হাসান বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ীই গাছ বিক্রির জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে এবং কোনো ধরনের দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, একটি মহল টেন্ডার প্রক্রিয়া বন্ধ করার উদ্দেশে বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ দিচ্ছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, বন বিভাগের রেঞ্জ সহকারী পরিচয়ধারী মো. হাসানই এই দুর্নীতি ও লুটপাটের মূল পরিকল্পনাকারী।
এ বিষয়ে বরগুনা-পটুয়াখালী অঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক নুরুন্নাহারের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিনিধি/এসএস