জেলা প্রতিনিধি
২৬ মার্চ ২০২৬, ১১:২৮ এএম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেছেন, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে আমরা প্রত্যেকবারই নিজেদের কাছে একটা প্রশ্ন রাখি- আমরা কি আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি অর্জন করতে পেরেছি? প্রতিবছরই আমাদের বলতে হয়, আমরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ না হলেও বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছি।
তিনি বলেন, ১৯৯০ এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে হয়েছে যে, যারা আমাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের কাছ থেকে আমরা প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা পাচ্ছি না। তবে, এবারের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা যা অর্জন করেছি, তাতে আমি বিশ্বাস করি- জনগণ আর রক্ত দিতে চায় না।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকালে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, নতুন যে সরকার এসেছে, আমার মনে হয়- যদি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয় এবং বিরোধী দল সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে সরকারের ইতিবাচক কাজগুলোতে সহযোগিতা করে, তাহলে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। অন্তর্বর্তী সরকারের (ইন্টারিম গভর্নমেন্ট) যে-সব অধ্যাদেশ গণস্বার্থে ঘোষণা করা হয়েছিল, সেগুলো যদি আমরা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি- সরকারি দল, বিরোধী দল এবং স্বতন্ত্র সবাইকে নিয়ে তাহলে একটি ইনক্লুসিভ, গণতান্ত্রিক এবং স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, বর্তমান নেতৃত্ব- বিশেষ করে সরকার প্রধান যেভাবে দেশ পরিচালনা করছেন, তাতে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে শর্ত একটাই- আমাদের সবাইকে দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে এসে মেধা, যোগ্যতা এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে এবং সেই আলোয় নেতৃত্বের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাহলেই আমরা অতীতের ব্যর্থতা অতিক্রম করে সফলতার দিকে এগিয়ে যেতে পারব। স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে এর বাইরে অন্য কোনো অঙ্গীকার থাকার প্রশ্নই ওঠে না- এটাই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।”
জাবি উপাচার্য বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আমরা কি সেটিকে সঠিকভাবে ধারণ করতে পারছি? আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধ হলো একটি শিশুর জন্মের মতো- বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস। ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনগুলোকে আমি দেখি সেই শিশুকে সুস্থ করে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে। ১৯৯০ সালে সেই অসুস্থতা এতটা জটিল ছিল না, কিন্তু ২০২৪ সালে আমরা যেন এক ধরনের গভীর অসুস্থতা- প্রায় ক্যানসার আক্রান্ত অবস্থার মধ্যে ছিলাম।
কামরুল আহসান বলেন, একটা বিষয় স্পষ্ট, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না। সেটাই আমাদের মূল পরিচয়। আমাদের উচিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে সমন্বয় করে একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সহাবস্থানের বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনোভাবেই খর্ব বা অবমূল্যায়ন করা যেতে পারে না। আমরা যদি এই জায়গায় মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হই, তাহলে ইতিহাস বিকৃতির ধারাবাহিকতায় আমরা আবার পথ হারাবো- যা আমরা কোনোভাবেই চাই না। আমরা সবাই মিলে একটি সঠিক, বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রচনা করতে চাই। সেই শুভ সূচনা এই নতুন সরকারের মাধ্যমেই হোক- এই প্রত্যাশা রাখি।
জাবি উপাচার্য বলেন, বাংলাদেশের সমসাময়িক অনেক রাষ্ট্র স্বাধীনতা অর্জনের পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেছে- এটা আমরা প্রায়ই বলি। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর কিছুটা দায় অবশ্যই আছে। আমাদের সমাজের অভ্যন্তরেও সমস্যা রয়েছে। আমরা দেখেছি- বেনজির, মতিউরের মতো ব্যক্তিরা মেধায় অসাধারণ হলেও নৈতিকতার দিক থেকে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এটি আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা।
তিনি বলেন, আমাদের দেশ থেকে যদি দুর্নীতি দূর করতে হয়, তাহলে শুধু রাজনীতিবিদ নয়- রাজনৈতিক কর্মী, সরকারি কর্মকর্তা, আমলা, শিক্ষক-সরকারি ও বেসরকারি সব স্তরের মানুষকেই নৈতিকভাবে আলোকিত হতে হবে। শুধু মেধা নয়, নৈতিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কামরুল আহসান বলেন, একইসঙ্গে আমাদের প্রশাসনিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই স্বচ্ছতার দিকনির্দেশনা দেবেন, কিন্তু আমরা সবাই যদি সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা না করি, তাহলে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে- যেমনটা আমরা অতীতে দেখেছি।
প্রতিনিধি/ এজে