উপজেলা প্রতিনিধি
২৪ মার্চ ২০২৬, ০২:২৮ পিএম
আগে চীনের দুঃখ যেমন ছিল হুয়াংহো নদী, এখন নারায়ণগঞ্জের দুঃখ হচ্ছে সংস্কারের অভাবে আবর্জনায় ভরাট হয়ে যাওয়া ফতুল্লার নিষ্কাশন খালগুলো।
এ কারণে, প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার অনেক আগেই সদর উপজেলার প্রকল্প বান্তবায়নের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ খালগুলো পরিষ্কার করা হয়।
কিন্তু এ বছর নতুন সরকার আসার পর থেকে এ বিষয়ে নির্বিকার প্রশাসন। খোদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কল্যাণী খালটি টেক্সটাইল ও গৃহস্থলী বর্জ্যে ভরাট হয়ে এর উপর ২ ফুট লম্বা ঘাস জন্মালেও, তা দেখার কেউ নেই।
এ কারণেই ফতুল্লা এলাকায় বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খাল-নালা ভরাট হয়ে থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এতে করে জনজীবন চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, এলাকার বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে থাকায় চলাচলে ভোগান্তি বেড়েছে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা ঘরবন্দি হয়ে পড়ছেন। অনেক স্থানে হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
সদর উপজেলার কল্যাণী খালটি একসময় এই অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম ছিল। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখল ও ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে খালটি সরু হয়ে গেছে। খালটি দখল মুক্ত হলেও পুনরায় খালটি খনন কাজ শুরু হয়নি।

ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে আশপাশের পয়ঃবর্জ্য পর্যন্ত খালে এসে পড়ছে না, এসব নোংরা পানিতে এখন উপজেলা পরিষদের আশপাশের রাস্তা পর্যন্ত সয়লাব।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর মধ্যে অন্যতম নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এনসিপি থেকে নির্বাচিত এমপি আল-আমিনের এখনও ঘোর কাটেনি। এমপি নির্বাচিত হওয়ার দেড় মাস পরও তিনি এলাকার জনগণের সঙ্গে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলা তো দূরের কথা, কুশল পর্যন্ত বিনিময় করেননি। তিনি পাশের নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সোনারগাঁও এলাকার সাংবাদিকদের সঙ্গে ইফতার পার্টিতে এনসিপির নেতাকর্মীদের নিয়ে অংশ গ্রহণ করলে, ফতুল্লার নানা সমস্যা নিয়ে ফোন দিলে ফোনটা পর্যন্ত ধরেন না।
ফতুল্লার কুতুবপুর দেলপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা আ. মালেক বলেন, খালগুলো পরিষ্কার করা হয় না বহু দিন ধরে। যার কারণে ড্রেন দিয়া ময়লা পানি সহজে সরে না।
ফতুল্লার কাশিপুর এলাকার উত্তর নরসিংপুরে ফরিদা বেগম বলেন, বাসা-বাড়ির ময়লা আবর্জনা ফেলার জন্য নেই এলাকায় কোনো ডাম্পিং জোন। তাই এলাকার মানুষ গৃহস্থলী সব ময়লা খালের পানিতে ফেলে। এতে ময়লা আবর্জনার কারণে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি মশার উপদ্রবও বেড়েছে। ময়লা পানিতে থাকা মশার কারণে ছোট-বড় সবাই নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। ইউনিয়ন সচিবরাও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না এ বিষয়ে।

স্থানীয়দের দাবি, বাসা-বাড়ির ময়লা-আবর্জনা এবং বিভিন্ন মিল-কারখানার পলিথিন ও বর্জ্যে এলাকার খালগুলো প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। ফলে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা অভিযোগ করেন, নির্বাচনের প্রায় দেড় মাস পার হলেও জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের নীরব ভূমিকা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। দ্রুত খালগুলো পরিষ্কার করা ও স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও নিয়মিত খাল সংস্কার ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অন্যথায় বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন জানান, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খালগুলো পরিষ্কার ও পুনঃখননের একটি সমন্বিত প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করছি। ইতোমধ্যে আমরা ফতুল্লার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কল্যাণী খালটি দখলমুক্ত করেছি। খালটি পুনরায় খনন করার জন্যও আমরা প্রস্তাব পাঠিয়েছি। খালটি খনন হলে ফতুল্লায় আর পানি জমে থাকবে না।
এদিকে কুতুবপুরে কংস নদীর যে সংযোগ খালটি রয়েছে, সেটার জন্যও কাজ অতি দ্রুত শুরু করব আমরা। অনেক জায়গায় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাজ শুরু করা হবে।
প্রতিনিধি/এসএস