জেলা প্রতিনিধি
২০ মার্চ ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম
এবার ঈদুল ফিতরে সাতদিন ছুটি পেয়েছেন চাকরিজীবীরা। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধু-বান্ধবদের সাথে এ লম্বা ছুটিতে হবে জম্পেশ আড্ডা। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ানো। তবে ঈদ আসলেই অনেকে কোথায় ঘুরতে যাবেন তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েন। ঘুরতে যাওয়ার কথা মনে আসলে প্রথমে নিরাপত্তা বিষয় ভাবনায় থাকে। তবে এবার যশোর জেলাতে দর্শনীয় স্থানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে জেলা পুলিশ।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার ঢাকা মেইলকে বলেন, ব্রিটিশ ভারতের প্রথম জেলা যশোর। প্রায় আড়াইশ বছরের পুরানো এই ঐতিহাসিক জেলায় রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থান। এর মধ্যে বেশকিছু স্থানের যেমন রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব, তেমনি রয়েছে শিল্প-সাহিত্যের পীঠস্থান। আবেগ-অনুভূতি আর বিনোদনের সংমিশ্রণে এই দর্শনীয় স্থানগুলো ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বরাবরই আকর্ষণীয়।
তিনি বলেন, এবার ঈদুল ফিতরে যশোর জেলাতে দর্শনীয় স্থানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে সাদা পোশাকে নারী ও পুরুষ থাকবে। এছাড়া সব সময় টহল ফোর্স থাকবে। একই সাথে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হলে দ্রুত জরুরি সেবা জানানো জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া সিসি ক্যামেরায় সব সময় মনিটরিং করা হবে।’

যশোর কালেক্টরেট ভবন
প্রায় আড়াইশ বছরের পুরানো ব্রিটিশ-ভারতের প্রথম জেলা যশোর। প্রথম শত্রুমুক্ত এই জেলার টাউন হল ময়দানের মুক্তমঞ্চে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। টাউন হল ময়দানের পাশেই শহরের অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান যশোর কালেক্টরেট ভবন। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে যশোর কালেক্টরেটের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কয়েক বছর আগে কালেক্টরেট ভবনটি আলোকসজ্জার আওতায় আনা হয়। ভবনের উত্তর পাশের চত্বরে রয়েছে কালেক্টরেট পার্ক এবং দক্ষিণ পাশে শানবাঁধানো পদ্মপুকুর। পুকুরের নানা রঙের মাছের ঝাঁক আর পদ্মফুলের দৃশ্য অসাধারণ। কালেক্টরেটের উত্তর পাশের রাস্তার ওপারেই রয়েছে মনোমুগ্ধকর ভৈরব পার্ক। ভবনের পশ্চিম পাশে মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি সড়কের (প্যারিস রোড) মনোমুগ্ধকর দৃশ্যতো অসাধারণ। সবমিলিয়ে কালেক্টরেট ভবন এবং এর আশপাশের এলাকাগুলো এখন ঈদ আড্ডায় জমজমাট হয়ে উঠেছে।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি
যশোর শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভিটা। সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি, মধুসূদন জাদুঘর, লাইব্রেরি ও সাগরদাঁড়ি পর্যটন কেন্দ্র এসব মিলিয়ে মধুপল্লী। মধুসূদন দত্তের বাড়ি সংলগ্ন রয়েছে সেই বিখ্যাত কপোতাক্ষ নদ। মধুসূদন দত্তের দ্বিতল বাড়িটি অপূর্ব নির্মাণশৈলীর জন্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত মধুপল্লী দর্শনে উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে ঈদের আনন্দ। মধুপল্লী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সাপ্তাহিক রোববার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিন বন্ধ থাকে।

চাঁচড়া শিব মন্দির
যশোর শহরের আশপাশের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের একটি চাঁচড়া শিব মন্দির। তিনশত ২৯ বছরের পুরোনো এই মন্দিরটি পুরাকীর্তি হিসেবে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো নির্মাণে আট-চালা রীতি অনুসরণ। পুরো মন্দিরের সামনের অংশ পোড়ামাটি দিয়ে অলংকৃত। এটি ছিলো চাঁচড়ার জমিদারবাড়ির অংশবিশেষ। কালের বিবর্তনে এবং মানুষের কবলে পড়ে এই মন্দিরটি ছাড়া রাজবাড়ির আর কিছুই এখন অবশিষ্ট নেই।

গদখালী ফুলের বাজার
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীকে ফুলের রাজধানী বলা হয়। কারণ সারা বাংলাদেশের ৮০ ভাগ ফুলের চাহিদা মেটায় এই গদখালী। যশোর জেলার ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার প্রায় ৯০টি গ্রামের ৪ হাজার বিঘা জমিতে ফুলের চাষ করা হয়। এখানে সবচেয়ে বেশি উৎপন্ন হয় রজনীগন্ধা, গোলাপ ও গাঁদা। সারা বছর বাহারি ফুলের সমারোহ থাকলেও এখানে যাওয়ার উপযুক্ত সময় হলো জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে।

ভরতের দেউল
যশোরের ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় এক স্থান কেশবপুর উপজেলার ভরতের দেউল বা ভরত রাজার দেউল। এটি উপজেলার ভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত প্রাচীন গুপ্ত যুগের খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। টিলা আকৃতির দেউলের উচ্চতা ১২.২০ মিটার এবং পরিধি ২৬৬ মিটার। চারপাশে চারটি উইং ওয়ালে ঘেরা ১২টি কক্ষ ছাড়া বাকি ৮২টি কক্ষগুলো বৌদ্ধ স্তূপাকারে তৈরি। আর স্তূপের চূড়ায় থাকা চারটি কক্ষের দুইপাশে আরও আটটি ছোট ছোট কক্ষ দেখা যায়। এখানে প্রাপ্ত নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে পোড়া মাটির তৈরি নারীর মুখমণ্ডল, নকশা করা ইট, পোড়ামাটির অলংকার, মাটির ডাবর এবং দেবদেবীর টেরাকোটার ভগ্নাংশ। ভরতের দেউল দেখতে ঈদের ছুটিতে প্রচুর দর্শনার্থীর উপস্থিতি ঘটে। এখানে ভ্রমণে বাড়তি পাওনা হতে পারে চুকনগরের বিখ্যাত আব্বাসের হোটেলের চুই ঝালের খাসির মাংসের স্বাদ গ্রহণ।

বেনাপোল স্থলবন্দর
ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে এটি অবস্থিত। ভারত বাংলাদেশের স্থল বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এটি পরিচিত। এখান থেকে কলকাতা ৮০ কিলোমিটার দূরে। বেনাপোলের বিপরীতে ভারতের অংশটির নাম পেট্রাপোল। এখান থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগও রয়েছে। লোকজন সাধারণত এখানে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত প্যারেড অনুষ্ঠান দেখতে যায়। প্যারেড দেখতে আসা দর্শনার্থীদের জন্য বসার জায়গা হিসেবে গ্যালারিও রয়েছে।
মীর্জানগর হাম্মামখানা
যশোরের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে মীর্জানগর জমিদার বাড়ি উল্লেখযোগ্য। কেশবপুর উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে কপোতাক্ষ ও বুড়িভদ্রা নদীর ত্রিমোহিনীতে মীর্জানগর গ্রামের অবস্থান। জমিদারবাড়ির হাম্মামখানা বা গোসলখানা তখনকার সময়কার স্থাপত্য শৈলির বিস্ময়। দশ ফুট উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত দুর্গের এক অংশে হাম্মামখানা স্থাপন করা হয়।
ধীরাজ ভট্টাচার্যের বাড়ি
কেশবপুর উপজেলার পাঁজিয়ায় প্রখ্যাত অভিনেতা ও সাহিত্যিক ধীরাজ ভট্টাচার্যের বাড়িও একটি দর্শনীয় স্থান। পুলিশের এই কর্মকর্তা ছিলেন সুসাহিত্যিক এবং অভিনেতা। তার পরিত্যক্ত বাড়িটিও দেখে আসতে পারেন ঈদের ছুটিতে। এছাড়া ঐতিহাসিক যশোর রোডসহ শহর, শহরতলি এবং আশপাশের এলাকাগুলোতে আরও অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে।

হনুমান গ্রাম
কেশবপুরে রয়েছে ভবঘুরে প্রজাতির প্রায় ৪০০ কালোমুখী হনুমানের আবাস, আর তাই এলাকাটি কেশবপুরের হনুমান গ্রাম নামে পরিচিত। বর্তমানে, কেবল বাংলাদেশের কেশবপুর এবং ভারতের নদীয়া জেলায় আচরণ এবং বুদ্ধিমত্তায় উন্নত কালোমুখ ভবঘুরে হনুমানের এই প্রজাতিটি দেখতে পাওয়া যায়।

দেশের দীর্ঘতম ভাসমান সেতু
যশোরের মণিরামপুরের ঝাঁপা বাওড়ের ওপর প্রায় ১৩০০ ফুট দীর্ঘ একটি ভাসমান সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় ৮৩৯টি নীল রঙের ভাসমান ড্রামের ওপর স্টিলের পাত ফেলে তৈরি করা। বাংলাদেশের প্রথম ও দীর্ঘতম দৃষ্টিনন্দন এই ভাসমান সেতু।
প্রতিনিধি/এসএস