জেলা প্রতিনিধি
২০ মার্চ ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
এক মাস সিয়াম সাধনার পরে এসেছে মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদ উল ফিতর। ঈদ উপলক্ষে দেশের সব স্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীরা পাচ্ছে ঈদের ছুটি। লম্বা কর্মকাল কাটানোর পরে ঈদের এই ছুটিকে আরো আনন্দঘন এবং উৎসব মুখর করতে সবাই পরিবার-পরিজন নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র বা বিনোদন কেন্দ্রে ছুটে যায়। আসন্ন ঈদ উপলক্ষে বিনোদন কেন্দ্রগুলো ইতোমধ্যে পর্যটকদের মনোরঞ্জন করার জন্য প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। দেশের বিভিন্ন জেলার মতো নরসিংদীতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। আসন্ন ঈদকে আরো উৎসবমুখর করতে নরসিংদীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা উন্মুক্ত স্থান দর্শনার্থীদের বরণ করতে প্রস্তুত হয়ে আছে।
ঈদ উপলক্ষে নরসিংদীর যে সব স্থানে ঘোরা যেতে পারে-

ড্রিম হলিডে পার্ক
ঈদসহ সব উৎবকে আরো আনন্দঘন করার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের অন্যতম আকর্ষণ থাকে নরসিংদী জেলার ড্রিম হলিডে পার্ক। বরাবরই এ পার্ক দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনার চৈতাবতে অবস্থিত প্রায় ৬০ একর জমি নিয়ে গড়ে উঠা নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কটি ঈদ উপলক্ষে আকর্ষণীয় রাইডের পাশাপাশি বর্ণিল সাজে সাজানো হয়ে থাকে। এবারো ঈদ উপলক্ষে চলছে তেমন আয়োজন। থাকবে পরিবার, বন্ধু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট গ্রুপ কিংবা পর্যটক সবার জন্যই বিনোদনের প্যাকেজ।

পার্কের ভিতরের রাইডসই কেবল দর্শনার্থীদের মূল আকর্ষণ যে তা নয়। পার্কে তৈরি করা সুপরিকল্পিত অবকাঠামো, মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং আধুনিক বিনোদন ব্যবস্থা মানুষের মন ভরিয়ে দেবে। মূল গেটে প্রবেশের জন্য জন প্রতি টিকিট মূল্য রাখা হয়েছে ৩৫০ টাকা। এই টিকিটের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পার্কের অভ্যন্তরীণ সাফারি পার্কে প্রবেশের ব্যবস্থা।

মূল গেটে প্রবেশের পরে বিভিন্ন রাইডে চড়তে আলাদা টিকিট কাটতে হয়। যে টিকেটগুলোর হয়ে থাকে ৭০ থেকে ৪৫০ টাকার মধ্যে।
পার্কের অভ্যন্তরীণ সাফারি পার্কে দর্শনার্থীরা অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ইমু পাখি ছাড়াও বিভিন্ন প্রাণী ও পরিবেশ উপভোগ করতে পারবেন। এছাড়া রয়েছে কৃত্রিম পাহাড়, সবুজ বাগান ও জলাশয় পার্কের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ।

এই পার্কে বিনোদনের পাশাপাশি রয়েছে ভূতের বাড়ি, ৯ ডি মুভি ও কাইটিংয়ের মতো আলাদা আকর্ষণ, যা দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আনন্দ দেয়।
এছাড়াও রোলার কোস্টার, জেড ফাইটার, স্পেসশিপ, বুলেট ট্রেন, এয়ার বাইসাইকেল ও বুল রাইডের মতো উত্তেজনাপূর্ণ এসব রাইড তরুণদের পাশাপাশি সাহসী দর্শনার্থীদেরকে দেয় আনন্দ।
পার্কের ভিতরের সোয়ান বোট, স্পিডবোট, বাম্পার কার, রকিং হর্স, সুইং কারসহ নানা ধরনের রাইড পরিবার এবং শিশুদের মনকে শান্তির পরশ দেবে।

বিভিন্ন রাইড চড়ে শরীর যখন ক্লান্ত এবং গরমের কারণে অস্বস্তি বোধ হবে তখন দর্শনার্থীরা যেতে পারবে ওয়াটার পার্কে। যেখানে রয়েছে ওয়েভ পুল। ওয়েভ পুলের কৃত্রিম ঢেউয়ের সঙ্গে সাঁতার কাটার কাটতে পারবে। এছাড়াও ওয়াটার স্লাইড, রেইনবো, ওয়াটার অ্যামব্রেলা এবং শিশুদের জন্য আলাদা পানির খেলার ব্যবস্থা তো আকর্ষণ হিসেবে থাকবেই।
ড্রিম হলিডে পার্কে প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ ও টয়লেটের ব্যবস্থার পাশাপাশি নারীদের জন্য রয়েছে ব্রেস্ট ফিডিং রুম। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন মানসম্মত রেস্টুরেন্ট ও খাবারের দোকান।

পার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রবীর কুমার সাহা জানান, একজন দর্শনার্থী এসে পরিবার পরিজন নিয়ে আনন্দ উপভোগ করার জন্য সব ব্যবস্থা আমরা পার্কে রেখেছি। এখানে আসার পরে সব কর্মব্যস্ততার কষ্ট ভুলিয়ে মনকে প্রশান্ত করবে। আমাদের পার্কের দর্শনার্থীরা আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি সবার সার্বিক নিরাপত্তার চিন্তা সর্বদাই আমাদের মাথায় থাকে।

গোল্ডেন স্টার পার্ক
ঈদে পরিবার-প্রিয়জনের সাথে ফুলের সৌন্দর্যে হারিয়ে যেতে চাইলে আসতে হবে নরসিংদী সদর উপজেলার বোখারী নগর, নাগরিয়াকান্দি ব্রিজ সংলগ্ন গোল্ডেন স্টার পার্কের ফুলের রাজ্যে। এই পার্কটি বাংলাদেশের অন্যতম কাঁচা ফুলের পার্ক। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিখ্যাত মিরাক্কেল গার্ডেনের আদলে তৈরি এই পার্কে রয়েছে গাঁদা, পেটুলিয়া, সিলভিয়া, সূর্যমূখী, টিউলিপসহ ৭ ধরনের ফুলের রাজ্য। ফুলের রাজ্যে আগত দর্শনার্থীদের মন মাতাতে এখানে রয়েছে প্যারা টোপার, সুইং চেয়ার, ফ্রিজ, বি, ট্রেন, স্লিপার, পাইরেট শিপ, স্কাই ড্রপ, মেরি গো রাউন্ড, কফি কাপ, নৌকা, টুইস্ট, সোয়ান, প্যাডেল বুট, মিনি বাইক অ্যান্ড কার, সুয়ান, ওয়াটার বাম্পার, জাম্পিং, বিচ বাইকের মতো আকর্ষণীয় রাইড। ৩ বছরের নিচের শিশু ছাড়া বাকিদের জন্য পার্কের প্রবেশ মূল্য ১৫০ টাকা। ঋতু ভেদে পার্কের ফুলে আনা হয় বৈচিত্র্য।
২০২৩ সালে ৫০ বিঘা জমির উপর নির্মিত এই পার্কটি দ্রুতই পর্যটকদের মন আকর্ষণ করেছে।

এই পার্কটি মেঘনা নদীর একেবারে পাশ ঘেঁষে তৈরি হওয়ায় এখানে নদীর সুন্দর দৃশ্য, ঠান্ডা বাতাস আর প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করা যায়।
পার্কের ভিতরে সাধ্যের মধ্যে খাবার খাওয়ার ব্যবস্থা ছাড়াও রয়েছে কসমেটিকস এবং বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী ক্রয় করার সুযোগ।
পার্কটির ম্যানেজার মাসুদ রানা জানান, আমরা আগত দর্শনার্থীদের পরিপূর্ণ বিনোদন দিতে সার্বিক চেষ্টা করে যাচ্ছি। দর্শনার্থীদের চাহিদা বিবেচনায় নতুন রাইড আনার পরিকল্পনা করছি।

নাগরিয়াকান্দি সেতু
ঈদের অবকাশ সময় কাটাতে মেঘনা নদীর উপর নির্মিত নাগরিয়াকান্দি সেতুতেও থাকে পর্যটকদের প্রচণ্ড ভিড়। নরসিংদী জেলা শহর থেকে মাত্র আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে হওয়ায় মোটরসাইকেল, অটো কিংবা মিশুক দিয়ে খুব সহজেই পৌঁছানো যায় এখানে। স্বল্প দূরত্ব ও মনোরম পরিবেশের কারণে বিকেলবেলা অনেকেই পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে ছুটে আসেন এই ব্রিজ এলাকায়। এলাকার সাধারণ জনগণের ধারণা, সব সময়ের মতো জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসবে।

চিনাদী বিল
নরসিংদীর শিবপুরের ঐতিহ্যবাহী চিনাদী বিল জেলার অন্যতম প্রাকৃতিক উপভোগের স্থান। সারা বছরই বিকাল বেলা এখানে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়। প্রায় ৫শ’ ৫০ বিঘা আয়তনের স্বচ্ছ পানির এই বিলজুড়ে যেমন রয়েছে হাজারও মৎস্য জীবের বিচরণ। তেমনি রয়েছে বক, চিল, মাছরাঙা, পান কৌড়ি, বালিহাঁসসহ বিভিন্ন পাখির বিচরণ ক্ষেত্র। নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে দুলালপুর ইউনিয়নে অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এই বিলে নেই কোনো প্রবেশ মূল্য। আগত দর্শনার্থীরা ঘণ্টা হিসেবে নৌকা ভাড়া করে বিলে ঘুরতে পারে। শেষ বিকালে সূর্যাস্তের সময় বিভিন্ন পাখির শব্দ শোনা যায়।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত চিনাদী বিল হয়ে উঠেছে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। চিনাদী বিলকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো গেলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে মনে করছেন স্থানীয় প্রশাসন। এরই মধ্যে স্থানীয় জেলা প্রশাসন এই স্থানটির নামকরণ করেছে ‘স্বপ্নচিনাদী’। আগত দর্শনার্থীরা বিলের সৌন্দর্য উপভোগ ছাড়াও এখানে হালকা নাস্তা, বাচ্চাদের খেলনা সামগ্রী ক্রয় করতে পারবে।

রামপুর বানরের রাজ্য
ঈদের আনন্দে যারা গ্রামের প্রকৃতি পছন্দ করেন তাদের জন্য আনন্দ দিতে প্রস্তুত মনোহরদী উপজেলার রামপুর বানরের মিনি রাজ্য। মনোহরদী উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তরে খিদিরপুর ইউনিয়নের রামপুর এলাকায় মানুষ আর বানরের বসবাস যুগ যুগ ধরে। ধারণা করা হয় সহস্রাধিক বানর এ রামপুর গ্রামে বসবাস করে। দল বেধে বানরেরা চলে আসে লোকালয়ে। তাদের দৌড়াদৌড়ি আর ছুটাছুটি মানুষের মনকে আনন্দ দেবে। তা ছাড়া এই অঞ্চলের পানের বরজের কথা দেশের সব মানুষের মুখে শোনা যায়। যারা ইট পাথরের শহরের বাহিরে গ্রামীণ জনপদে স্বস্তির নিশ্বাস নিতে চান তারা রামপুর গ্রামে ঘুরেঘুরে গ্রামীণ মানুষের জীবন চিত্র, পান পানের বরজ, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠের পাশাপাশি বানরের দল দেখে আনন্দ নিতে পারেন মনোহরদীর এই রামপুর থেকে। পাশাপাশি সাগরদী জমিদার বাড়ি, খিদিরপুরের মটের মতো প্রাচীন স্থাপত্য নির্মাণ শৈলী দেখতে পারবেন।

এছাড়াও রায়পুর উপজেলার পান্থশালা ফেরিঘাট, সোনাইমুড়ী পাহাড়, বেলাব উপজেলার উয়ারি-বটেশ্বর, প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম ড্রেনের ঘাট সেতু, আড়িয়াল খা নদীর উপর নির্মিত বিন্নাবাইদ-পোড়াদিয়া সেতু, সাগরদী বাইপাস সড়ক, জেলা জুড়ে বিভিন্ন প্রকৃতির সংস্পর্শে গড়ে উঠা রেস্টুরেন্টগুলো এবারের ঈদ যাত্রায় নরসিংদীতে আগত পর্যটকদেরকে সাদরে গ্রহণ করতে প্রস্তুত।
নিরাপত্তার বিষয়ে নরসিংদী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন চন্দ্র সরকার জানান, জেলা জুড়েই আইন শৃঙ্খলা পরিবেশ স্বাভাবিক ও নিরাপদ রাখতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মহাসড়কে টহল বসানো হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোশাকধারী পুলিশ ডিউটিরত থাকবে। অন্যান্য বাহিনীর সাথে সমন্বয় রেখে সব জায়গায় কাজ করা হচ্ছে। নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো সমস্যা আশা করি হবে না।
প্রতিনিধি/এসএস