জেলা প্রতিনিধি
২০ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জলাপাড়া গ্রামের নীরব পরিবেশে অবস্থিত আহছানিয়া মিশন শিশু নগরী। চারপাশে শান্ত নির্জনতা, আর ভেতরে ভেসে আসে শিশুদের হাসির শব্দ। এখানে বর্তমানে ১৬০ জন এতিম, পথশিশু ও পরিবারহীন শিশু আশ্রয় পেয়েছে-যাদের কেউ হারিয়ে গেছে, কেউ পরিত্যক্ত, আবার কেউ জানেই না নিজের বাড়ির ঠিকানা।
আসন্ন ঈদুল ফিতরকে ঘিরে এই শিশুদের জীবনে আনন্দ আর আক্ষেপ-দুটোই পাশাপাশি চলে।
১২ বছর বয়সি সাগর ইসলাম এখনো মনে করতে পারে পুরান ঢাকার সেই বাড়ির কথা। ছোটোবেলায় হারিয়ে গিয়ে দীর্ঘ সাত বছর কাটিয়েছে কমলাপুর এলাকায়। পরে এক সমাজকর্মীর মাধ্যমে আশ্রয় পায় এই শিশু নগরীতে।
সাগরের ভাষায়, এখানে এসে ভালোই লাগে। ঈদে নতুন কাপড়, আতর, মেহেদি সবই পাই।

একই গল্প ১১ বছর বয়সি ফাহিমের। ছয় বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়ার পর আর খুঁজে পায়নি পরিবারকে। মা আগেই মারা গেছেন, আর বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদ সেই হারানোর দিন থেকেই। আবেগঘন কণ্ঠে ফাহিম বলে, ইচ্ছা ছিল পরিবারের সাথে ঈদ করব। কিন্তু এখন স্যাররাই আমার পরিবার।
তার স্মৃতিতে এখনো ভেসে ওঠে পথশিশুর কঠিন জীবন-বটল কুড়ানো আর অনিয়মিত খাবারের দিনগুলো। তবে এখানে এসে পেয়েছে নতুন জীবন-খাবার, পড়াশোনা ও পোশাক সবই বিনামূল্যে।
আট বছরের শুকুর আলীকেও একসময় স্টেশন থেকে উদ্ধার করা হয়। বাইরে ঈদের আনন্দ তার কাছে ছিল অচেনা। এখন সে বলে, এখানে মেহেদি দেয়, ভালো খাবার হয়-অনেক ভালো লাগে।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে হারিয়ে যাওয়া ১৪ বছর বয়সি সাজ্জাদুল ইসলাম বাইজিদের গল্পও কষ্টে ভরা।
আমার মা দোকানে গেছিল, আমি ঘুরতেছিলাম। পরে দেখি মা নাই। বলতে বলতেই কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তার। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবারকে ভুলতে পারেনি সে। সবার মতো আমারও পরিবারের সাথে ঈদ করতে ইচ্ছা করে, যোগ করে বাইজিদ।
ইমাম মাহাদী (১৪) হারিয়ে যায় ২০১৯ সালে। ঢাকায় এসে পথশিশুর জীবনে নানা নির্যাতনের শিকার হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় আশ্রয় পায় এই শিশু নগরীতে।
মাহাদী বলে, এখানে ঈদের নামাজ পড়ি, পড়ালেখা করি। স্যাররাই এখন আমার মা-বাবা।

সাত বছর বয়সি জয়নালের গল্প আরও হৃদয়বিদারক। তার দাবি, সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছেন তার বাবা-মা। দীর্ঘ ঘোরাঘুরির পর একসময় এই শিশু নগরীতেই ঠাঁই পায় সে।
শিশু নগরীর সমাজকর্মীরা জানান, এখানে থাকা ১৬০ জন শিশুর জন্য একটি পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়, যেন তারা ঈদের সময় একাকিত্বে না ভোগে।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সেন্টার ম্যানেজার জানান, ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি শিশুদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার পূর্ণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে আসছে। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে নতুন পোশাক, উন্নত খাবার এবং বিশেষ আয়োজন হিসেবে মাংসের জন্য ছাগলও কেনা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য একটাই, পরিবারহীন এই শিশুদের মুখে যেন ঈদের হাসি ফোটে, আর কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পারে জীবনের কষ্টগুলো।
প্রতিনিধি/এসএস