জেলা প্রতিনিধি
১৬ মার্চ ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম
সমাজ ও পরিবারের নানা বাধা অতিক্রম করে জীবনের সংগ্রামে সাফল্য অর্জন করেছেন সাতক্ষীরার পাঁচ নারী। তাঁদের জীবনসংগ্রাম, সাহস ও সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ‘অদম্য নারী পুরস্কার-২০২৫’-এর জন্য তাঁদের নির্বাচিত করেছে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক অধিদফতর।
পাঁচটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত এই নারীদের প্রত্যেকের জীবনে রয়েছে সংগ্রাম, প্রতিকূলতা জয় এবং আত্মবিশ্বাসের অনন্য গল্প।
অর্থনৈতিকভাবে সফল নারী: রায়হাতুল জান্নাত রিমি
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন সাতক্ষীরা সদরের কাটিয়া লস্করপাড়া এলাকার রায়হাতুল জান্নাত রিমি। ছোটোবেলায় বাল্যবিবাহ, দাম্পত্য নির্যাতন, ব্রেইন স্ট্রোক এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, একাধিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও তিনি জীবনসংগ্রামে হার মানেননি।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাল্যবিবাহের শিকার হন রিমি। প্রথম স্বামীর প্রতারণা ও সংসার ভাঙনের পর এক কন্যাসন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর কঠিন জীবনযুদ্ধ। অসুস্থতা কাটিয়ে তিনি আবার পড়াশোনা শুরু করেন এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় সাতক্ষীরা জেলায় প্রথম হন। পরে হস্তশিল্প ও বিউটি পার্লারের কাজ শিখে নিজেকে দক্ষ করে তোলেন।
ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর সাতক্ষীরা শহরের নারিকেলতলা মোড়ে একটি বিউটি পার্লার ও বুটিকস চালু করেন। বর্তমানে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে পোশাক, কসমেটিকস ও জুয়েলারি বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। বিজয় মেলায় সেরা স্টল পুরস্কার এবং ব্র্যাকের পক্ষ থেকে সেরা উদ্যোক্তার সম্মাননাও পেয়েছেন। পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন ও স্ট্রিট ফুডের স্টল পরিচালনার মাধ্যমে আরও কয়েকজন নারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে পৌরসভা নারী সুরক্ষা ফোরামের সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
শিক্ষা ও চাকরিক্ষেত্রে সফল নারী: গুলশান আরা বেগম
শিক্ষা ও চাকরিক্ষেত্রে সাফল্যের স্বীকৃতি পেয়েছেন সাতক্ষীরা সদরের বাগানবাড়ি গ্রামের গুলশান আরা বেগম। ছোটোবেলা থেকেই মেধাবী এই নারী পারিবারিক আর্থিক সংকট ও বাল্যবিবাহের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যান।
স্বল্প আয়ের পরিবারে বেড়ে ওঠা গুলশান আরা প্রাথমিক পর্যায়ে বৃত্তি অর্জন করেন। পরে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। বিবাহের পরও সংসারের দায়িত্ব সামলে স্নাতক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০০ সালে তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে সি.ইন.এড ও বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেন।
করোনাকালে অনলাইন পাঠদান, গুগল মিটের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়া এবং ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরির মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ২০২৩ সালে সাতক্ষীরা জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষিকা এবং ২০২৪ সালে খুলনা বিভাগের শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হন। সাহিত্যচর্চাতেও তিনি সক্রিয়; তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ এবং প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
সফল জননী: লুৎফুন নেছা বেগম
সফল জননী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন লুৎফুন নেছা বেগম। শৈশবে মায়ের মৃত্যু ও সৎমায়ের নির্যাতনের মধ্য দিয়ে বড় হওয়া লুৎফার জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর বাল্যবিবাহ হয়। এরপর শ্বশুরবাড়ির নানা প্রতিকূলতা ও নির্যাতনের মধ্যেও তিনি সংসার সামলান।
স্বামীর স্বল্প আয়ের সংসারে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে তিনি গরু, হাঁস-মুরগি ও কবুতর পালন, সেলাই কাজসহ নানা পরিশ্রমী কাজ করেন। নিজের সন্তানদের শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তিনি। বর্তমানে তাঁর সন্তানরা উচ্চশিক্ষা অর্জন করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
নির্যাতিতা থেকে স্বাবলম্বী: মেরিনা খাতুন
নির্যাতনের বিভীষিকা কাটিয়ে নতুন জীবন শুরু করা নারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন শ্যামনগর উপজেলার পরানপুর গ্রামের মেরিনা খাতুন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাল্যবিবাহের শিকার হন তিনি। স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যান।
একপর্যায়ে স্বামী তাঁর শিক্ষাগত সনদপত্র ছিঁড়ে ফেলেন এবং গুরুতর নির্যাতন করেন। এমনকি তাঁর হাতের আঙুল কেটে দেওয়া ও হত্যাচেষ্টার মতো ঘটনাও ঘটে। পরে সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে এসে তিনি স্বামীকে তালাক দেন এবং নতুন করে জীবন শুরু করেন। বর্তমানে দর্জির কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন এবং দুই সন্তানকে শিক্ষিত করার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। কিছুদিন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উত্তরণে কাজও করেছেন তিনি।
সমাজ উন্নয়নে অবদান: মোহিনী পারভীন
সমাজ উন্নয়ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত হয়েছেন সাতক্ষীরা সদরের মধ্যকাটিয়া মিলবাজার এলাকার মোহিনী পারভীন। একজন সচেতন সমাজকর্মী হিসেবে তিনি এলাকায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সমাধানে কাজ করছেন। পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মানব পাচার প্রতিরোধ, বন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণ সহায়তা এবং যুবসমাজকে খেলাধুলার মাধ্যমে মাদকমুক্ত রাখতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই পাঁচ নারী তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসাধারণ সাহস, অধ্যবসায় ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের সংগ্রামী জীবনের গল্প অন্য নারীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিনিধি/এসএস