জেলা প্রতিনিধি
১৫ মার্চ ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
নেত্রকোনায় হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় পার হয়েছে ১৫ দিন আগে। তবে এখনো অনেক বাঁধে মাটি কাটার কাজই শেষ হয়নি। এরই মধ্যে বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় আগাম বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে হাওরের কৃষকরা এবার ফসলহানির আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
নীতিমালা অনুযায়ী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তদারকিতে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে প্রকল্প নির্ধারণ এবং ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠনের কাজ চূড়ান্ত হওয়ার কথা। আর বাঁধের নির্মাণকাজ ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে মার্চ মাসের অর্ধেক সময় অতিবাহিত হলেও এখনো সবগুলো বাঁধে মাটি কাটার কাজ শেষ করতে পারেনি পাউবো।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, জেলায় তাদের অধীনে প্রায় ৩৬৫ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ আছে। এ বছর ১৩৭ দশমিক ৫৭৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে ২০২টি পিআইসি গঠন করা হয়েছে। এতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। গঠিত ২০২টি পিআইসির মধ্যে খালিয়াজুরীতে ১৪৩টি, মোহনগঞ্জে ২৯টি, মদনে ১৯টি ও কলমাকান্দায় ১০টি প্রকল্প রয়েছে।
আজ রোববার জেলার মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী উপজেলার বেশ কয়েকটি বাঁধ ঘুরে দেখা গেছে, অনেকগুলোতে এখনো মাটি কাটার কাজই শেষ হয়নি। যেসব বাঁধে মাটি কাটা শেষ হয়েছে, সেগুলোতেও ড্রেসিং ও দুর্বা ঘাস লাগানোসহ অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে।
মদন উপজেলার তলার হাওর উপ-প্রকল্পের (তিয়শ্রী অংশ) ব্রিজ ক্লোজিং বাঁধের দৈর্ঘ্য প্রায় এক কিলোমিটার। আজ ১৫ মার্চ পর্যন্ত এই বাঁধের ৩০০ মিটার অংশে কোনো মাটিই পড়েনি। সবেমাত্র ভেকু (এক্সাভেটর) দিয়ে মাটি কাটার কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পের সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, ‘ভেকু নষ্ট থাকায় কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে। ২৩ লাখ টাকার কাজের বিপরীতে বিল পেয়েছি মাত্র দেড় লাখ টাকা। এখন নিজের টাকা দিয়ে কাজ করছি। কয়েক দিনের মধ্যে শেষ করে ফেলব।’
এ বিষয়ে মদন উপজেলার দায়িত্বে থাকা পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাঁধের সব কাজ এত দিনে শেষ হওয়ার কথা। মাটি কাটার কাজ যে এখনো বাকি, তা আমার জানা ছিল না। আমি সরজমিনে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছি।’
স্থানীয় কৃষকরা জানান, হাওরের এই বাঁধগুলোর ওপর প্রায় ৪৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নির্ভর করে। এই ফসলের আয়ের ওপরই কৃষকদের সারা বছরের সংসার খরচ, চিকিৎসা ও সন্তানদের লেখাপড়াসহ সব ব্যয় মেটানো হয়। কিন্তু এবার বাঁধের কাজ যথাযথভাবে না হওয়ায় আগাম বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ার ভয় কাজ করছে সবার মনে।
খালিয়াজুরী উপজেলার জগন্নাথপুর এলাকার কৃষক রহিদুল মিয়া বলেন, ‘এবার বাঁধের অবস্থা খুবই খারাপ। বালু মাটি দিয়ে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। অনেক জায়গায় কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। দুই দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে; এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে পানি বেড়ে ফসল তলিয়ে যাবে। এই নড়বড়ে বাঁধ পানি আটকাতে পারবে না।’
মদন উপজেলার তিয়শ্রী এলাকার কৃষক আলমাস মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে অথচ বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। একটিমাত্র বোরো ফসলের ওপর আমাদের লাখো পরিবার নির্ভরশীল। কৃষকদের বাঁচাতে আমরা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’ মোহনগঞ্জ উপজেলার তেতুলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদির জানান, শেষ সময়ে মাটি কাটায় তা শক্ত হয়ে বসার সুযোগ পায়নি। ফলে সামান্য পানির চাপেই বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগে ঠিকাদারের মাধ্যমে বাঁধ মেরামত করা হতো। কিন্তু ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় বাঁধ ভেঙে ফসলহানির পর পাউবোর কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এরপর ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে পিআইসি ব্যবস্থা চালু হয়। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও সভাপতি এবং পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী সদস্য সচিব হিসেবে কমিটি পরিচালনা করেন। জেলা পর্যায়ে সভাপতি থাকেন জেলা প্রশাসক।
জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘মদন উপজেলার একটি বাঁধে মাটি কাটা শেষ হয়নি বলে খবর পেয়েছি। সেখানে উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে পাঠানো হয়েছে। তিনি রিপোর্ট দেবেন। তবে বাকি সব বাঁধে মাটি কাটা শেষ হয়েছে এবং ঘাস লাগানো হচ্ছে। এই মুহূর্তে সামান্য বৃষ্টিতে বন্যার কোনো শঙ্কা নেই।’
প্রতিনিধি/একেবি