images

সারাদেশ

ঠাকুরগাঁওয়ে জ্বালানি তেলের সংকট, বিপাকে চালক ও কৃষক

জেলা প্রতিনিধি

০৯ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪১ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই, তবে বাস্তবে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।

কৃষিনির্ভর জেলা ঠাকুরগাঁওয়েও দেখা দিয়েছে জ্বালানি তেলের সংকট। জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন না থাকায় বিপাকে পড়েছেন মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহন চালকরা। একই সঙ্গে ফসলের সেচ নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।

ঠাকুরগাঁও পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, ঠাকুরগাঁও জেলায় বর্তমানে ৩৭টি পেট্রোল ও ডিজেল ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২৪টি, বালিয়াডাঙ্গীতে ২টি, হরিপুরে ২টি, রাণীশংকৈলে ৫টি এবং পীরগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে ৪টি ফিলিং স্টেশন। এসব ফিলিং স্টেশনে প্রতিদিন পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের সম্মিলিত চাহিদা প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ লিটার।

রোববার (৮ মার্চ) জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক পাম্পে তেল না থাকায় কার্যক্রম বন্ধ করে রাখতে হয়েছে। আবার কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে সীমিত পরিমাণে শুধু ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, কিছু স্থানে খোলা বাজারে বেশি দামে পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে এ বিষয়ে ক্যামেরার সামনে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি বিক্রেতারা।

জ্বালানি সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন যানবাহন চালকরা। মোটরসাইকেল চালক আবু তালহা বলেন, “পাম্পে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কাজকর্মে দারুণ সমস্যা হচ্ছে।”

ট্রাক চালক আব্দুল হাসেম বলেন, “ডিজেল না পেলে গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। এতে আমাদের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”

কিছু ক্রেতার অভিযোগ, জ্বালানির দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা মাহাবুব হোসেন বলেন, “সরকার বলছে দেশে জ্বালানির সংকট নেই, কিন্তু পাম্পে গেলে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।”

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে কৃষিক্ষেত্রেও। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ঠাকুরগাঁও জেলার মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৯৩ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে বিদ্যুৎচালিত সেচ এবং প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহার করা হয়।

চলতি মৌসুমে জেলায় বোরো ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। তবে ডিজেল সংকটের কারণে অনেক কৃষক সময়মতো সেচ দিতে না পারার আশঙ্কা করছেন।

স্থানীয় কৃষক ফজলুর রহমান শহরের একটি পাম্পে এসেছিলেন ডিজেল নিতে। ডিজেল না পেয়ে তিনি বলেন, “ডিজেল নিতে এসে পেলাম না। এখন বোরো ধানের চারা কীভাবে লাগাব? তেল না পাওয়ায় জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে ফসল ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।”

আরেক কৃষক নূর জামাল বলেন, “চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় আছেন।”

তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় ডিজেলের কোনো ঘাটতি নেই। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোছাম্মাৎ শামীমা নাজনীন জানান, রোববার পর্যন্ত জেলায় প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮০ লিটার ডিজেল মজুদ রয়েছে।

অন্যদিকে, ফিলিং স্টেশনের মালিক ও ম্যানেজারদের দাবি, ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। স্থানীয় একটি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মনঞ্জুর হাসান বেলাল বলেন, “ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না।”

রুপশী ফিলিং স্টেশনের মালিক রাম বাবু বলেন, “যেখানে আগে পেট্রোল ও অকটেন মিলিয়ে ৯ হাজার লিটার তেল দেওয়া হতো, সেখানে এখন অকটেন নেই। রোববার রাতে পেট্রোল ৩ হাজার লিটার দেওয়ার কথা আছে।” তিনি আরও বলেন, “যদিও আমরা সরকারি নিয়ম মেনে তেল দিচ্ছি, তবুও অনেকেই বোতল ও জারকিনে করে তেল মজুদ করছেন। এতে সংকট আরও বেড়ে যাচ্ছে।”

ঠাকুরগাঁও পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাক জানান, জেলার ৩৭টি পেট্রোল ও ডিজেল ফিলিং স্টেশনের মধ্যে শুধু শহরের চারটি স্টেশনে রাতে তেল এসেছে। বাকি স্টেশনগুলো প্রায় শূন্য হয়ে পড়ে আছে।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, “কেউ যদি অসাধু উপায়ে জ্বালানির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিবহন খাতের পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিনিধি/এসটি