জেলা প্রতিনিধি
০৮ মার্চ ২০২৬, ১১:৫১ এএম
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নে ৭৫ বছর বয়সি এক বৃদ্ধের বসতভিটা দখলের উদ্দেশে হামলা ও গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের খালকুলা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী বৃদ্ধের নাম মো. হারেজ মোল্লা। তিনি তার পরিবার নিয়ে গত ২৫ বছর ধরে এই ভিটেতে বসবাস করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হারেজ মোল্লা ২০০২ সালে প্রতিবেশী সিরাজ মোল্লার কাছ থেকে ২২ শতাংশ জমি কেনার জন্য ৩৫ হাজার টাকা বায়না দেন। দীর্ঘ সময় পার হলেও সিরাজ মোল্লা জমি রেজিস্ট্রি করে না দিয়ে তালবাহানা করতে থাকেন। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদে অভিযোগ দিলে ২০০৬ সালে সিরাজ মোল্লা স্ট্যাম্পে বায়নানামা করে দেন। কিন্তু রেজিস্ট্রি না দিয়ে উল্টো হারেজ মোল্লাকে উচ্ছেদের জন্য মামলা করেন সিরাজ মোল্লা। ওই উচ্ছেদ মামলায় ২০১২ এবং ২০২২ সালে দুই দফায় আদালত হারেজ মোল্লার পক্ষে রায় দেন।

অভিযোগ উঠেছে, আদালতের রায় পাওয়ার পর সিরাজ মোল্লা ২০২৫ সালে ওই ২২ শতাংশ জমি গোপনে প্রতিবেশী মুসা নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর থেকেই হারেজ মোল্লার পরিবারকে উচ্ছেদের জন্য নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। সর্বশেষ দুর্বৃত্তরা হারেজ মোল্লার ভিটেতে থাকা মূল্যবান মেহগনি গাছ কেটে ফেলেছে এবং বাড়িতে হামলা চালিয়ে বৃদ্ধের পরিবারকে ভিটেছাড়া করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের।
বৃদ্ধ হারেজ মোল্লা বর্তমানে বয়সের ভারে ন্যুহ। তার ছেলেরা ভ্যান চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালান। ২৫ বছরের স্মৃতিবিজড়িত এই বসতভিটা রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী এই পরিবারটি।
হারেজ মোল্লার প্রতিবেশী ও গ্রামবাসী জানান, হারেজ মোল্লা দীর্ঘ বছর ধরে এই ভিটেতেই বসবাস করছেন। এলাকাবাসী হিসেবে তারা জানেন যে, এই জমির জন্য তিনি অনেক আগে সিরাজ মোল্লাকে টাকা দিয়েছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রতিবেশী বলেন, হারেজ মোল্লা অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। আমরা বছরের পর বছর ধরে দেখে আসছি, তিনি সপরিবারে এই বাড়িতেই থাকছেন। সিরাজ মোল্লা জমি রেজিস্ট্রি করে না দিয়ে উনার সঙ্গে অন্যায় করছেন। এমনকি আদালত যখন হারেজ মোল্লার পক্ষে রায় দিল, তখন জমিটা গোপনে অন্য মানুষের কাছে বিক্রি করে দেওয়াটা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। গত কয়েকদিন আগে ওনার বাড়ির গাছগুলো কেটে ফেলেছে, যা দেখে আমরাও অবাক হয়েছি।
আরেক প্রতিবেশী বলেন, একজন ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ মানুষকে এই বয়সে এভাবে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা খুবই অমানবিক। উনার ছেলেরা ভ্যান চালিয়ে টেনেটুনে সংসার চালায়, তাদের তো আর কোনো জমি বা ঘর করার সামর্থ্য নেই। আমরা চাই, প্রশাসন বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করে এই অসহায় পরিবারটিকে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু রক্ষা করার ব্যবস্থা করে দিক।
হারেজ মোল্লার ছেলে মো. নিলু মোল্লা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা গরিব মানুষ, দিনভর ভ্যান চালিয়ে যা আয় করি তা দিয়ে কোনোমতে আমাদের সংসার আর বাবার ওষুধের খরচ চলে। আমাদের বাবা ২৫ বছর আগে অনেক কষ্টে জমানো টাকা দিয়ে এই জমি সিরাজ মোল্লার কাছ থেকে কিনেছিলেন। অথচ দীর্ঘ সময় পার হলেও তিনি জমি রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছেন না। উল্টো আমাদের উচ্ছেদ করার জন্য আদালতে মামলা করেছিলেন। আদালত দুই দুইবার আমাদের বাবার পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিন্তু রায় আমাদের পক্ষে যাওয়ার পর সিরাজ মোল্লা আমাদের সাথে আরও অন্যায় শুরু করেছেন। তিনি গোপনে জমিটা অন্য জায়গায় বিক্রি করে দিয়ে এখন আমাদের বসতবাড়ি দখল করার জন্য লোক পাঠাচ্ছেন।
আরেক ছেলে মো. হালিম মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, গত কয়েকদিনে তারা আমাদের মেহগনি গাছগুলো নির্বিচারে কেটে ফেলেছে। বাড়ির ওপর হামলা চালিয়ে আমাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে, যাতে আমরা বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। আদালতের রায় যেখানে আমাদের পক্ষে, সেখানে আইনের তোয়াক্কা না করে কীভাবে তারা আমাদের উচ্ছেদ করতে চায়? আমরা দিনমজুর মানুষ, আমাদের তো আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। আমরা প্রশাসনের কাছে এই জমি দখলের চেষ্টা এবং হামলার বিচার চাই।

ভুক্তভোগী বৃদ্ধ হারেজ মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, আমি এই ভিটেতে পরিবার নিয়ে গত ২৫ বছর ধরে বসবাস করছি। ২০০২ সালে অনেক কষ্ট করে জমানো ৩৫ হাজার টাকা সিরাজ মোল্লাকে দিয়েছিলাম এই ২২ শতাংশ জমির জন্য। ভেবেছিলাম শেষ বয়সে নিজের মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই হবে। কিন্তু সে জমি লিখে না দিয়ে বছরের পর বছর ধরে আমাকে ঘুরাচ্ছে। এমনকি আদালত দুইবার আমার পক্ষে রায় দেওয়ার পরেও সে গায়ের জোরে জমিটা অন্য লোকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন তারা দলবল নিয়ে এসে আমার লাগানো মেহগনি গাছ কেটে ফেলেছে এবং আমাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। আমি বৃদ্ধ মানুষ, আমার ছেলেরা ভ্যান চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালায়। এই বয়সে পরিবার নিয়ে আমি এখন কোথায় যাব? আমি প্রশাসনের কাছে এর সঠিক বিচার চাই।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সিরাজ মোল্লা বলেন, আমি জমি হারেজ মোল্লার কাছে বিক্রি করিনি। প্রতিবেশী মুসার কাছে বিক্রি করেছি।
ইসলামপুর ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে আদালতে মামলা চলমান। আমরা দুই পক্ষকে অনুরোধ জানাই আইন মেনে চলার জন্য।
ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান আবুল হোসেন খান বলেন, এ ঘটনায় অনেক সালিশ বিচার করেও কোনো সুরাহা হয়নি।
উল্লেখ্য, বর্তমানে হারেজ মোল্লার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। ঘরবাড়ি হারানোর ভয়ে পরিবারের নারী ও শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তারা এই ভূমিদস্যুতা রুখতে এবং নিজেদের পৈতৃক ভিটে রক্ষায় রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের জরুরি হস্তক্ষেপ ও ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছেন।
প্রতিনিধি/এসএস