জেলা প্রতিনিধি
০৫ মার্চ ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম
বাংলাদেশকে নদীমাত্রিক দেশ বলা হলেও উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে একের পর এক নদী ও খালের নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে কৃষকদের মাঝে। একসময় ৩৬টি নদ-নদীর প্রবাহে সমৃদ্ধ এ জনপদে এখন দৃশ্যমান রয়েছে মাত্র সাত থেকে আটটি নদী। তাও আগের মতো নেই স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও গভীরতা। ফলে কৃষি ও পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই দেখা দিয়েছে বহুমাত্রিক প্রভাব।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কার্যকর নদীশাসন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ নদী-খাল ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও জেগে উঠেছে চর, কোথাও নদীর বুকে চলছে চাষাবাদ। এতে বর্ষার পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে, আবার খরার সময় দেখা দিচ্ছে সেচ সংকট।
৮০ কোটির খনন—তবুও টেকেনি সুফল
২০১৮–২০১৯ অর্থবছরে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো এবং কৃষিকাজে নদীর পানি ব্যবহারের লক্ষ্যে জেলার সাতটি নদী ও একটি খাল খনন করা হয়। এতে ব্যয় হয় ৮০ কোটিরও বেশি টাকা।

তবে স্থানীয়দের দাবি, অপরিকল্পিত ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই নদীগুলো আবার ভরাট হয়ে যায়। অনেক স্থানে যথাযথ স্লোপ ও গভীরতা বজায় না রাখায় পলি জমে দ্রুত নাব্যতা কমে গেছে।
সেচে বাড়তি খরচ, কমছে লাভ
খাল ও নদীতে পানি না থাকায় কৃষকদের এখন প্রধান ভরসা শ্যালো মেশিন। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে সেচ দিতে গিয়ে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়। এতে উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারদর অনিশ্চিত থাকায় লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

স্থানীয় কৃষক মো. জাহিদুল ইসলাম, মহিনি বর্মন, মো. আব্দুল গফুর ও মো. হাসান আলীসহ অনেকে জানান, বর্ষায় যদি খাল-নদীতে পানি ধরে রাখা যেত, তাহলে খরার সময় এত খরচ করে সেচ দিতে হতো না। পরিকল্পিতভাবে পুনঃখনন করলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, মাছের উৎপাদনও বাড়বে।
তাদের মতে, শুধু খনন নয়—বর্ষার পানি সংরক্ষণ, পাড় সংরক্ষণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। না হলে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল মিলবে না।

পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে
নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। জলাশয় কমে যাওয়ায় কমছে দেশীয় মাছের প্রজাতি। শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশগত সংকট তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

২৪ নদী-খাল পুনঃখননের প্রস্তাব
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. গোলাম জাকারিয়া ঢাকা মেইলকে জানান, সারাদেশে খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে জেলায় ২৪টি নদী ও খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী খনন করা হলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমবে, খরা মৌসুমে পানি সংরক্ষণ সম্ভব হবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির উন্নতি ঘটবে, সেচে জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং আবাদি জমির পরিমাণ বাড়বে।
আরও পড়ুন
টেকসই উদ্যোগের দাবি
কৃষিনির্ভর এই জেলায় খাল ও নদীগুলো পরিকল্পিতভাবে পুনঃখনন ও সংরক্ষণ করা গেলে শুধু কৃষকরাই নয়, উপকৃত হবেন জেলে ও সাধারণ মানুষও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান, বৈজ্ঞানিক জরিপ এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা জরুরি।
কৃষকদের প্রত্যাশা—সরকার ঘোষিত উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন হোক এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে নদীগুলো ফিরে পাক তাদের হারানো প্রাণ।
প্রতিনিধি/টিবি