২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম
চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতাল লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফয়সাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, বডি শেমিং ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির ইকো বিভাগে চতুর্থ শ্রেণির এক নারী কর্মচারী প্রথমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে এই লিখিত অভিযোগ করেছেন।
ওই নারী কর্মী জানিয়েছেন, ২০২২ সালের ৬ নভেম্বর থেকে দীর্ঘদিন ধরে কর্মক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ ও মানসিক চাপে রয়েছেন তিনি। অভিযোগের প্রতিকার চাইতে গিয়ে উল্টো তাকে অভিযোগ প্রত্যাহার ও অন্যত্র চাকরি খোঁজার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ দেওয়ার পর সন্তোষজনক প্রতিকার না পেয়ে গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ওই নারী কর্মী চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ পলিটেকনিক রোডে অবস্থিত কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের উপ-মহাপরিদর্শকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী নারী কর্মী জানান, গত ৮ ফেব্রুয়ারি ম্যাক্স হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালকের কাছে এ সংক্রান্ত লিখিত অভিযোগ করেছেন। এর আগেও একই হাসপাতালে যৌন হয়রানি সংক্রান্ত আরও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) যৌন হয়রানির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের উপ-পরিদর্শক মাহবুব হাসান। তিনি বলেন, এ ধরনের আচরণ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ৩৩২ ধারা এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী। ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট এলাকার শ্রম পরিদর্শক গোবিন্দ মজুমদারকে তদন্তের জন্য কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শ্রম আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিবরণে বলা হয়, হাসপাতালের মহাব্যবস্থাপক মো. ফয়সাল উদ্দিন বিভিন্ন সময় কাজের বাইরে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতেন। তার বাসা কোথায়, বেতন কত, ওই বেতনে পরিবার চলে কি না-এ ধরনের প্রশ্ন তুলে তাকে বিব্রত ও মানসিকভাবে চাপে রাখা হতো। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ তার জন্য অপমানজনক ও অস্বস্তিকর।
অভিযোগে আরও বলা হয়, অফিস শেষে দেরি হলে ওই কর্মকর্তা তাকে ব্যক্তিগতভাবে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দিতেন। নারী কর্মীর ভাষ্য, এ ধরনের প্রস্তাব তার কাছে সন্দেহজনক ও অনভিপ্রেত মনে হয়েছে। ইভিনিং শিফটে দায়িত্ব পালনকালে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলের কক্ষে প্রবেশ করে তার শারীরিক গঠন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হতো। ধারাবাহিক এ পরিস্থিতির কারণে তিনি পরে নিজের ডিউটি রোস্টার পরিবর্তন করে মর্নিং শিফটে নেন বলে জানান।
সাম্প্রতিক সময়েও তার হাসি ও ঠোঁটের সাজ নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। একটি অডিও রেকর্ড নিজের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। যেখানে তাকে উদ্দেশ করে আপনি কী সুন্দর হাসতেছেন দেখেন তো। লিপস্টিকটা কত দারুণ লাগতেছে-এমন মন্তব্য শোনা যায় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের উপ-মহাপরিদর্শকের কাছে অভিযোগে বলা হয়, ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়ার পর গত ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় তাকে হাসপাতালে ডাকা হয়। সেখানে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. রিঙ্কু দাশসহ আরও পাঁচজন উপস্থিত ছিলেন।
ভুক্তভোগীর দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের পরিবর্তে তাকে অভিযোগ প্রত্যাহার করে অন্যত্র চলে যেতে চাপ দেওয়া হয় এবং এ চাপ এখনও অব্যাহত রয়েছে। চাকরি হারানোর আশঙ্কা ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন জানিয়ে তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত, কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ম্যাক্স হাসপাতালের মহাব্যবস্থাপক মো. ফয়সাল উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। শুক্রবার জুমা শেষে হাসপাতালে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার অনুপস্থিতে দায়িত্বে থাকা মিলি মারমাসহ ডেস্কে থাকা কয়েকজন নারী বলেন, এই অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। স্যার খুব ভালো মানুষ। তিনি হাসপাতালে এসেছেন পাঁচ-ছয় মাসের মতো। তাছাড়া স্যারের অফিসের সামনে ডেস্কে এতো-এতো সুন্দর মেয়ে থাকতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকে কেন যৌন হয়রানি করবেন। এটা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য।
প্রতিনিধি/ক.ম/