জেলা প্রতিনিধি
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৬ এএম
রমজানের শুরু থেকে জয়পুরহাটের মাঠে মাঠে আলু তোলার ধুম পড়েছে। নারী শ্রমিকরা মাটির বুক চিরে বের করছে আলু। প্রতি শতকে বিভিন্ন জাতের আলু চার থেকে সাড়ে চার মণ করে ফলন হচ্ছে। কিন্তু বাজারে আলুর দাম না থাকায় কৃষকদের চোখে মুখে চিন্তার ভাঁজ দেখা যাচ্ছে। ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জয়পুরহাটের চাষিরা। দিন যত যাচ্ছে, বাজারে আলুর দর আরও পতন হচ্ছে। বর্তমান বাজার অনুযায়ী আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, বিঘাপ্রতি বড় অঙ্কের লোকসান গুণতে হচ্ছে কৃষকদের। ফলন ভালো হলেও দামের এই অস্থিতিশীলতা নিয়ে চিন্তিত কৃষি বিভাগও।
বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বয়স হওয়ায় চাষিরা আলু তুলছেন কিন্তু দাম কম হওয়ায় বিক্রি না করে এসব আলু রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখছেন। বিক্রির করতে গেলেই তাদের দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
কৃষকদের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে আলু চাষে সার, বীজ, সেচ, নিড়ানি, ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে যে বাজার দর; তাতে প্রতি বিঘার আলু বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিঘাপ্রতি তাদের লোকসান গুণতে হচ্ছে ২০ হাজার টাকারও বেশি।

স্থানীয় বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে সাদা জাতের ডায়মন্ড আলু এবং লাল স্টিক জাতের প্রতি মণ (৪০ কেজি) আলু ২০০ থেকে ২২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আর গ্যানোলা জাতের আলু বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। সিন্ডিকেট নাকি চাহিদার অভাব, ঠিক কী কারণে এই আকস্মিক দরপতন, তা নিয়ে কৃষকদের মনে জন্ম নিয়েছে তীব্র ক্ষোভ। চাষিরা বলছেন, সরকারিভাবে আলু রফতানি করা গেলে এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতো না তাদের।
জেলার কালাই উপজেলার সড়াইল মাঠে নারী শ্রমিকদের নিয়ে আলু তুলছেন কৃষক সাখাওয়াত হোসেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কয়েকদিন আগেও এক মণ আলু ৬০০ টাকায় বিক্রি করেছি। আজ সেই আলু ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এখন আলুর দাম বেশি হওয়ার কথা। কারণ হিমাগারগুলোতে আলু ক্রয় করছেন। তা না দাম আরও কমে যাচ্ছে। আমরা কৃষকরা এখন যাবো কোথায়?

ওই মাঠেই আরেক কৃষক আব্দুল লতিফ বলেন,‘বর্তমান সরকারকে আমাদের মতো চাষিদের কথা চিন্তা করে আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে চাষিদের চাষাবাদ ছেড়ে দিতে হবে। এভাবে লোকসান হতে থাকলে আমাদেরকে পথে বসতে আর খুব বেশি সময় লাগবে না।
সবজি রফতানিকারক আব্দুল বাসেদ বলেন, বিগত বছরগুলোতে প্রচুর পরিমাণ আলু রফতানি করা হলেও এবার শুরুই হয়নি। অন্যান্য সবিজ রপ্তানি করা হলেও আলুর রফতানি নেই বললেই চলে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গত দুই বছর আগে রফতানিতে সরকারের পক্ষ থেকে ২০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হলেও এবার তা কমে ১০ শতাংশ করা হয়েছে, ফলে রফতানি কম হচ্ছে।

জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আনোয়ারুল হক বলেন, সরকার যদি ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে দেয়, তবে এখানে অনেক উদ্যোক্তা গড়ে উঠবে। এতে আলু বিদেশে রপ্তানি করা সহজ হবে এবং কৃষকরাও লোকসানের হাত থেকে বাঁচবেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলাম বলেন,‘এবার জেলায় ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। জেলায় আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা যায়। তাহলে যেমন কর্মসংস্থান হবে, তেমনই চাষিরা আলুর ন্যায্যমূল্য পাবেন। এতে সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব পাবে।
প্রতিনিধি/এসএস