জেলা প্রতিনিধি
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম
চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদি ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মমিনপুর মাদরাসা মসজিদে গত ছয় দশক ধরে কোনো প্রকার হাদিয়া ছাড়াই হাফেজগণ খতমে তারাবি পড়িয়ে আসছেন। শুধু তাই নয়, এই মাদরাসায় হিফজ সম্পন্ন করা হাফেজদের মাধ্যমে মমিনপুর গ্রামের আরও ১৫টি মসজিদে একযোগে তারাবি নামাজ পড়ানো হয়, যেখানে কোনো বিনিময় বা হাদিয়া গ্রহণ করা হয় না। হিফজ বিভাগের জন্য এই মাদরাসার দেশজুড়ে বিশেষ খ্যাতি রয়েছে।
সরেজমিনে মাদরাসা ও মসজিদ সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
জেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরত্বে মাদরাসা ও মসজিদের অবস্থান। রিকশা বা অটোবাইকে যেমন যাওয়া যায়, তেমনি নদীপথেও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে। চান্দ্রা-গল্লাক সংযোগ সড়ক থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে সাহেব বাজার এবং পূর্ব দিকে মাদরাসার মূল ক্যাম্পাস।
ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা এই মাদরাসার পরিবেশ অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। নদীর পশ্চিম পাশে মাদরাসার অবস্থান এবং দক্ষিণ দিক থেকে শুরু হয়েছে মাদরাসা ভবন। মাঝখানে নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের একটি দ্বিতল মসজিদ। এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা কেফায়েত উল্লাহ জানান, জেলা সদরের বিভিন্ন মসজিদে হাফেজদের হাদিয়া দেওয়ার প্রচলন থাকলেও মমিনপুর মাদরাসা এর ব্যতিক্রম। এখানে কখনোই হাদিয়া দেওয়া বা নেওয়ার প্রচলন ছিল না। মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম হাফেজ মাওলানা মুহসিন (রহ.) যে ধারা শুরু করেছিলেন, তা আজও অব্যাহত রয়েছে।
এ বছর মাদরাসা মসজিদে খতমে তারাবি পড়াচ্ছেন হাফেজ মো. মাহমুদ ও হাফেজ ওবায়দা। হাফেজ মাহমুদ বলেন, "আমি গত দুই বছর ধরে এই মসজিদে খতমে তারাবি পড়াচ্ছি। বিনিময়ে কোনো হাদিয়া নেইনি এবং এভাবে সেবা দিতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।" হাফেজ ওবায়দা জানান, এর আগেও তিনি বিনিময় ছাড়া অন্য মসজিদে তারাবি পড়িয়েছেন এবং গত ৩ বছর ধরে এই মসজিদে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৮৮ সালে এই মাদরাসা থেকে হিফজ সম্পন্ন করা হাফেজ আব্দুল বারেক বলেন, ‘এই মাদরাসার ঐতিহ্য দেশজুড়ে সমাদৃত। এখানকার হাফেজদের তারাবি পড়ানোর জন্য কোনো আলাদা ইন্টারভিউ দিতে হয় না। এখান থেকে একজন শিক্ষার্থী শুধু হিফজই সম্পন্ন করে না, বরং নৈতিক ও মানবিক শিক্ষারও অনন্য পাঠ পায়।’ বর্তমানে এই মাদরাসার হাজার হাজার শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশে নানা পেশায় দক্ষতার সাথে কাজ করছেন।
মমিনপুর মাদরাসার মুহতামিম হাফেজ রাশেদ জানান, প্রতি বছর যারা হিফজ সম্পন্ন করেন, তারাই গ্রামের সবগুলো মসজিদে খতমে তারাবি পড়ান। প্রতিটি মসজিদে ২ থেকে ৪ জন হাফেজ নিয়োগ করা হয়। মূলত হিফজ শেষ করার পর তারাবি পড়ানোর মাধ্যমেই তাদের কর্মজীবনের যাত্রা শুরু হয়। পুরো রমজান শেষে মুসল্লিদের মিষ্টিমুখ করানোর মাধ্যমেই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়।
তিনি আরও বলেন, এই মসজিদে প্রায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় খতমে তারাবি পড়িয়েছেন হাফেজ ফজলুর রহমান। তাঁর ইন্তেকালের পর শিক্ষার্থীরা সেই ঐতিহ্য ও ধারা পরম মমতায় ধরে রেখেছেন।
প্রতিনিধি/একেবি