জেলা প্রতিনিধি
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২৭ পিএম
অলিকূল শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রহ.) এর জন্য সিলেটের নামের সঙ্গে রয়েছে ‘পুণ্যভূমি’। মাজারের খাদেম পরিবারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে মাজারটি। তবে মাজারকে কেন্দ্র করে কমছে না অপরাধীদের অপরাধ প্রবণতা।
পুলিশও সেই সব অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও হিমশিম খাচ্ছে। একই সঙ্গে মাজারে ভাসমান মানুষ ও ভিক্ষুকদের দৌরাত্ম্য দিনে দিনে বেড়েই চলছে। মাজারে থাকা ভাসমান মানুষ ও ভিক্ষুকদের কারণে অনেকটা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয় ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও দেশ-বিদেশ থেকে আগত পর্যটকদের। মাজার থেকে ভাসমান মানুষ, ভিক্ষুকদের দৌরাত্ম্য আর মাজার সংলগ্ন কবরস্থানের চারপাশে দেওয়া হচ্ছে সীমানা প্রাচীর। সেই সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে মাজার কর্তৃপক্ষ তদারকি করার জন্য ইতোমধ্যে স্থাপন করেছেন অর্ধশতাধিক সিসি ক্যামেরা। সেই সঙ্গে রয়েছে মহানগর পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
জানা যায়, হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে প্রতিদিনই আসেন কয়েকহাজার দেশ-বিদেশের পর্যটকদের। সেই সঙ্গে এই মাজারকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা তাদের বিশেষ বিশেষ কার্যক্রম শুরু করেন মাজার জিয়ারত ও নামাজ আদায়ের মধ্যে। এজন্য মাজারে প্রতিদিনই থাকে পুলিশের কড়া নিরাপত্তার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি। মাজারসহ আশপাশের অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পার্শ্ববর্তী এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে সিলেট মহানগর পুলিশের শাহজালাল (রহ.) তদন্ত কেন্দ্র। সেই সঙ্গে রয়েছে মাজার কর্তৃপক্ষের নিজেদের নিরাপত্তা বলয়। এতো কিছুর পরেও ভাসমান মানুষ, ভিক্ষুক আর অপরাধীদের দমানো যাচ্ছে না। এদের কারণেই মাজার লাগোয়া কবরস্থান, মাজারের অভ্যন্তর, মাজার লাগোয়া সড়কে ময়লা আবর্জনা ফেলে রাখার পাশাপাশি মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা।

মাজারের খাদেম সামুন মাহমুদ খান বলেন, আমাদের লোকবলের পাশাপাশি মাজারে রয়েছে পুলিশসহ গোয়েন্দাদের কঠোর নজরদারি। আগের তুলনায় এখানে ভিক্ষুক ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা কমেছে। তবে রাতে অনেকেই ইবাদত করার পর মাজার প্রাঙ্গণেই ঘুমিয়ে পড়েন। তাদেরও রাখা হয় নজরদারিতে। সেই সঙ্গে আমাদের মাজার এলাকায় অন্তত অর্ধশতাধিক সিসি ক্যামেরা লাগানো রয়েছে। সেগুলো পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি মাজারের অফিস থেকেও নজরদারি করা হয়। মাজারে ভাসমান মানুষ ও ভিক্ষুকরা বিভিন্নস্থানে পরিবেশ নোংরা করে ফেলে। সেজন্য তাদেরকে সরিয়েও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মাজার এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি আমাদের ২০ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী শুধু পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন কয়েকধাপে। এছাড়া মাজার লাগোয়া কবরস্থানসহ অন্যান্য বিষয় তদারকি করার জন্য আলাদা আলাদা লোকবল রয়েছে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মীসহ অন্যান্য লোকবলের ব্যয় মাজার কর্তৃপক্ষ বহন করে।

প্রতিমাসে কতটাকা ব্যয় হয় এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আনুমানিক ৩-৪ লাখ টাকা ব্যয় হয় শুধু রক্ষণাবেক্ষণকারীদের বেতন বাবদ। এছাড়া মাজারের শৌচাগার, রান্না ঘরের লোকবলসহ অন্যান্য বিভাগে কাজ করা লোকবলের বেতন মাজার থেকে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহজালাল (রহ.) তদন্ত কেন্দ্রের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রতিমাসে অন্তত ৪/৫টি অজ্ঞাত ভাসমান নারী-পুরুষের মরদেহ মাজার এলাকা থেকে উদ্ধার করতে হয় পুলিশকে। সেই সঙ্গে রয়েছে ভিক্ষুক ও মাজারে থাকা ভাসমান মানুষের মাদকসক্ত থাকার প্রবণতা। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ অ্যাকশনে নামলেই পুলিশকে তারা উল্টো হয়রানি করে ফেলে (কাপড় খুলে ফেলা, পাথর কিংবা ইট নিক্ষেপ করা, পুলিশের সঙ্গে পাগলামি)। এসব কারণে পুলিশ লাজ লজ্জার ভয়ে অনেক কিছু করার থাকলেও পুলিশ করতে পারে না। তবে অন্যান্য অপরাধীদের ক্ষেত্রে পুলিশ সবসময় অভিযান চালায়। সেই সঙ্গে মাজারে থাকে বিশেষ নজরদারি।

সিলেট সিটি করপোরেশন প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন জানান, মাজারের পরিচ্ছন্ন কর্মী মাজারের অভ্যন্তরে কাজ করে। আর সিসিকের পরিচ্ছন্নতা কর্মী মাজারের সড়কসহ আশপাশ পরিষ্কারের কাজ করে থাকে ভোরে ও রাতে। এই দুবেলা ছাড়াও জরুরি কাজেও পরিচ্ছন্ন কর্মীরা মাজারে কাজে সহযোগিতা করে থাকে। সেই সঙ্গে যেকোনো সময় মাজার কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা চাইলে তাদের সহযোগিতা করা হয়।
সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানার ওসি মাঈনুল জাকির বলেন, শাহজালাল মাজারে একটি চক্র রয়েছে যারা বিক্ষিপ্তভাবে অপরাধের সঙ্গে জড়িত। এদের কাজই হচ্ছে মাজারে আসা নারী-পুরুষদেরকে টার্গেট করে মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা হাতিয়ে নেওয়া। এরকম ঘটনায় থানায় জিডিও হচ্ছে। একই সঙ্গে পুলিশও এদেরকে নানা সূত্র ধরে আটক করার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থাও নিচ্ছে। সেই সঙ্গে এই চক্রের সদস্যরা মাজারে আসা ভক্ত ও পর্যটকদের যানবাহনকেও টার্গেট করে। পুলিশের তৎপরতায় এগুলো অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। মাজারে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি পুলিশেরও নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং সিসি ক্যামেরাও সবসময় তদারকিতে রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে ভাসমান মানুষ ও ভিক্ষুকরাও মাদক সেবন কিংবা বিক্রিতে যারা জড়িত তাদেরকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি মাজারের নিরাপত্তারক্ষীরাও নিরাপত্তার দিকটা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। মাজারে কয়েক ধাপে পুলিশের নিরাপত্তা রয়েছে।
মাজারের খাদেম সামুন মাহমুদ খান জানান, ছিনতাইকারী, প্রতারকচক্র, মাদকসেবীসহ অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ ও মাজারের নিরাপত্তারক্ষীরা। সেই সঙ্গে মাজারে আগত পর্যটকদের সচেতন করা হয় মাজারের পক্ষ থেকে। নিরাপত্তার স্বার্থে সিসি ক্যামেরাও সবসময় তদারকি করা হয়। সব মিলিয়ে এখন নিরাপত্তার দিকটা অনেক বেশি শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সাইফুল ইসলাম জানান, শাহজালাল মাজারে যাতে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাশাপাশি অপরাধ করতে না পারে সেজন্য প্রতিদিনই পুলিশের কঠোর নজরদারি থাকে। একই সঙ্গে পুলিশের টহল টিম ও গোয়েন্দা পুলিশও কাজ করার পাশাপাশি মাজারে নিজস্ব লোকবল রয়েছে। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি তাদেরকে কেউ যাতে হয়রানি কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত না করতে পারে সেদিকে পুলিশের নজর রয়েছে। একই সঙ্গে মাজার এলাকার আশপাশের হোটেলগুলোও তদারকিতে রাখা হয়।
প্রতিনিধি/টিবি