জেলা প্রতিনিধি
২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুন্সিগঞ্জ জেলার তিনটি সংসদীয় আসনের দুটিতেই বিএনপির দুর্গে বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। তিনটির মধ্যে নির্বাচনি বৈতরণি পাড়ি দিতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি বিএনপি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৭ বছর আগে হারানো আসনগুলো পুনরুদ্ধারের সুযোগ হাতছানি দিলেও, দলীয় কোন্দলে বিএনপির জন্য সমীকরণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এ সুযোগে বিএনপির দীর্ঘদিনের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মুন্সিগঞ্জের দুইটি আসনে ভাগ বসাতে মরিয়া জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত জোটভুক্ত দল।
রাজধানী ঢাকার পাশের জেলা মুন্সিগঞ্জে সংসদীয় আসন তিনটি। শ্রীনগর ও সিরাজদীখান উপজেলা নিয়ে গঠিত মুন্সিগঞ্জ-১ আসন, টঙ্গীবাড়ি ও লৌহজং উপজেলা নিয়ে গঠিত মু্ন্সিগঞ্জ-২ এবং জেলা সদর ও গজারিয়া উপজেলা নিয়ে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসন।

এর মধ্যে শুধু মুন্সিগঞ্জ-২ আসনেই বিএনপি নির্ভর। বাকি দুটিতেই দল মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়ছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা।
মুলিগঞ্জ-১ আসনে মনোনয়ন বঞ্চিত শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মমিন আলী এবং মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে সদ্য বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোহাম্মদ মহিউদ্দিন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তাদের কারণে নির্বাচনি হিসাব-নিকাশ জটিল হয়ে গেছে বিএনপির। এ অবস্থায় ঘরের আগুন নেভানোর চেষ্টায় ইতোমধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীদের দল থেকে বহিষ্কার করেছে হাই কমান্ড।

মুসিগঞ্জ-১ আসন: এ আসনে বিএনপির প্রার্থী শেখ মো. আব্দুল্লাহ। তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সিরাজদীখান উপজেলা বিএনপির সভাপতি।
তার পাশাপাশি এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. মমিন আলী। এতে আসনটিতে বিএনপির ভোট দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী, মমিন আলী এ আসনে ২০০৪ সালের উপনির্বাচনে মাহী বি চোধুরীর সঙ্গে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। অন্যদিকে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী শেখ মো. আবদুল্লাহর বাড়ি সিরাজদীখান উপজেলায়। ফলে দলে বিদ্রোহের পাশাপাশি উপজেলাভিত্তিক আঞ্চলিকতার হিসাব মেলাতে হবে এই আসনে।

নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জ-১ আসন নানা কারণেই আলোচিত। এটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এ আসনে বিএনপি থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন দলটির সাবেক মহাসচিব ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ডা. এ কিউ এ বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি বিএনপি ছাড়ার পর ২০০৪ সালে গড়ে তোলেন বিকল্প ধারা বাংলাদেশ। এরপর এখানকার বিএনপি নেতারা একাধিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে।
এ আসনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের একক প্রার্থী দলটির জেলা সেক্রেটারি অধ্যাপক এ কে এম ফখরুদ্দীন রাজী। জোটের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনি এলাকায় গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি।
এছাড়াও এ আসনে আব্দুর রহমান (কাস্তে), রাজিব (দাঁড়িপাল্লা),আতিকুর রহমান খান (হাতপাখা) ও একমাত্র নারী প্রার্থী রোকেয়া আক্তার (আপেল) প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মুন্সিগঞ্জ-২ আসন: এ আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচীব আব্দুস সালাম আজাদ। এই আসনে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। ফলে আব্দুস সালাম আজাদ অনেকটা নির্ভয় থেকে নির্বাচনি প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ আসনে বিএনপির প্রার্থীর প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১০ দলীয় জোটের এনসিপির প্রার্থী মাজেদুল ইসলাম প্রচারণা নিয়ে মাঠে সরব রয়েছেন।
পাশাপাশি এ আসনে আশিক মাহমুদ (চেয়ার), কে এম বিল্লাল (হাতপাখা), এবং মো. নোমান মিয়া (লাঙল) প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।

মুন্সিগঞ্জ-৩ আসন: এ আসন জেলার রাজনীতিতে এই আসনের তাৎপর্য অনেক। গুরুত্বপূর্ণ এ আসনের নির্বাচনি তৎপরতা ও ফল পুরো জেলায় প্ৰভাব ফেলে। এই আসনটি মূলত শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় এখান থেকে নীতি নির্ধারণ ঠিক করা হয় জেলার অন্যান্য উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের রাজনীতির গতিপথ।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান রতন। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বহিষ্কৃত সদস্য সচিব মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।

মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে, মো. কামরুজ্জামান রতনের মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই লাগাতার বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে দলের একাংশের নেতাকর্মীরা। এই অবস্থায় বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কামরুজ্জামান রতনকে নিজ দলের মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
এই আসনে বিএনপির অন্তঃকলহ প্রকট আকার ধারণ করেছে। দ্রুতই এর সমাধান করা না হলে ভোটে তার প্রভাব পড়বে। এ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের নুর হোসাইন নুরানী। বিএনপির বিদ্রোহের ফায়দা নিজ ঘরে তুলতে প্রস্তুত জোটভুক্ত দলগুলো। ব্যক্তিগত সুসম্পর্কে কৌশল হিসেবে কাজে লাগিয়ে এই আসনের আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংককে টার্গেট করছে তারা।

এছাড়াও এ আসনে ভোটের মাঠে নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন, জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী আরিফ উজ্জামান দিদার (লাঙ্গল), শেখ মো। কামাল (কাস্তে), শেখ মো. শিমুল (কোদাল) এবং সুমন দেওয়ান (হাতপাখা)।
এতে মুন্সিগঞ্জের সুশীল সমাজের স্থানীয় প্রবীণ নাগরিকরা বলছেন জেলার তিনটি সংসদীয় আসনের মধ্যে দুইটিতে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় নির্বাচনি বৈতরণি পাড়ি দিতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। এখনই সঠিক পরিকল্পনা করে বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলে বিভেদ ঘুচিয়ে দল গোছাতে না পারলে হাত ছাড়া হতে পারে বিএনপির দুর্গ বলে পরিচিত মুন্সিগঞ্জ।

তবে, দলীয় বিভক্তি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সব নেতাকর্মীকে একযোগে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। দলটির দলীয় মনোনীত প্রার্থীরা।
প্রতিনিধি/এসএস