জেলা প্রতিনিধি
২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১০ এএম
বিয়ের আগে দেখা কনের বদলে বাসর রাতে দেখা গিয়েছে ভিন্ন নারী। এমনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগকে কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁওয়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য। কনে বদলের অভিযোগ, যৌতুক দাবি ও প্রতারণার পাল্টাপাল্টি মামলায় শেষ পর্যন্ত জামিন না পেয়ে জেলহাজতে যেতে হয়েছে বরকে।
ভুক্তভোগী বর রায়হান কবিরের অভিযোগ, পারিবারিকভাবে পছন্দ করা ও বিয়ে করা কনে বাসর রাতে বদলে গেছে। অন্যদিকে মেয়ের পরিবার বলছে, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ— মূলত যৌতুক আদায়ের চাপ সৃষ্টির কৌশল।
ঘটনায় অভিযুক্ত কনে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ভান্ডার এলাকার বাসিন্দা জিয়ারুল হকের মেয়ে জেমিন আক্তার। তার সঙ্গে বিয়ে হয় একই জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর এলাকার মৃত ইব্রাহীমের ছেলে রায়হান কবিরের।
দীর্ঘ সময় ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে মীমাংসার চেষ্টা চললেও কোনো সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি গড়ায় আদালতে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার (১৯ জানুয়ারি) জামিন নামঞ্জুর হওয়ায় বর রায়হান কবিরকে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
বর পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটক মোতালেবের মাধ্যমে বিয়ের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। গত জুলাই মাসের শেষদিকে রাণীশংকৈলের শিবদিঘী এলাকার একটি চায়ের দোকানে পাত্রী দেখানো হয়। সে সময় পাত্রীকে পছন্দ হলে বিষয়টি ঘটককে জানানো হয়।
পরবর্তীতে মেয়ের পরিবার ছেলের বাড়িতে এসে নতুন করে আর মেয়ে দেখার প্রয়োজন নেই জানিয়ে দ্রুত বিয়ের প্রস্তাব দেয়। বর পক্ষের দুলাভাই মালয়েশিয়া প্রবাসী হওয়ায় সময়ের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে দ্রুত বিয়ে সম্পন্ন করার অনুরোধ জানানো হয়। এতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়।
বর পক্ষের দাবি, ১ আগস্ট রাত ১১টার দিকে দুটি মাইক্রোবাসে বরযাত্রী নিয়ে মেয়ের বাড়িতে বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। ভোর ৪টার দিকে তারা নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। তবে বাসর রাতে বর রায়হান কবির বুঝতে পারেন— যে কনেকে আগে দেখানো হয়েছিল, তিনি সেই নারী নন।
বরের মামা বাদল ঢাকা মেইলকে বলেন, অতিরিক্ত মেকআপের কারণে বিয়ের রাতে বিষয়টি বোঝা যায়নি। কিন্তু বাসর রাতে মুখ ধোয়ার পর মেয়ের চেহারা দেখে আমার ভাগ্নে নিশ্চিত হয়— কনে বদলে গেছে। পরদিন আমরা মেয়েকে তার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে প্রতারণার কারণ জানতে চাই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটক ও মেয়ের বাবা পরিকল্পিতভাবে কনে বদল করে প্রতারণা করেছেন।
মেয়ের পরিবারের পাল্টা বক্তব্য
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মেয়ের বাবা জিয়ারুল হক বলেন, আমার তিন মেয়ের মধ্যে এটি দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ে। ছেলেপক্ষ নিজেরাই আমাদের বাসায় এসে মেয়েকে দেখে গেছে। বিয়েতে ৭০ জন বরযাত্রী ছিল। এমন অবস্থায় কনে বদলের বিষয়টি অবাস্তব।
তিনি দাবি করেন, বিয়ের পরদিনই ছেলেপক্ষ ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। জমি বিক্রি করে দেওয়ার প্রস্তাবে তিনি সময় চাইলে তারা রাজি হয়নি। এরপরই মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয় বলে তার দাবি।
পাল্টাপাল্টি মামলা
ঘটনার জেরে গত ২৭ আগস্ট মেয়ের বাবা জিয়ারুল হক বাদী হয়ে ঠাকুরগাঁও আদালতে মামলা করেন। এতে বর রায়হান কবির ও তার দুলাভাই মানিক হাসানকে আসামি করা হয়। অপরদিকে ২ সেপ্টেম্বর বর পক্ষও মামলা দায়ের করে, যেখানে মেয়ের বাবা জিয়ারুল হক ও ঘটক মোতালেবকে আসামি করা হয়।
ঘটক মোতালেব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি কোথাও বাইরে মেয়ে দেখাইনি। মেয়ের বাসাতেই মেয়ে দেখানো হয়েছিল। বিয়ের পরবর্তী ঘটনায় আমি জড়িত নই।
আইনজীবীর বক্তব্য
ঠাকুরগাঁও বার কাউন্সিলের সভাপতি ও বর পক্ষের আইনজীবী জয়নাল আবেদিন বলেন, ছেলে পক্ষ কনে বদলের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগ করেছে। শুরুতে মীমাংসার শর্তে জামিন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো সমাধান না হওয়ায় বর্তমানে বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে।
এই ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে— এমন প্রত্যাশাই এখন সাধারণ মানুষের।
প্রতিনিধি/এফএ