images

সারাদেশ

ঠাকুরগাঁও-১: ফখরুল-দেলোয়ারের লড়াইয়ে জমজমাট ভোটের মাঠ

২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০৭ এএম

দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁও। আর এই জেলার সদর উপজেলার ২২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনি উত্তাপ। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মো. দেলাওয়ার হোসেন, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের ঠাকুরগাঁও জেলার সহ-সভাপতি ডা. হাফেজ মো. খাদেমুল ইসলাম এই আসনে লড়বেন।

শুধু ঠাকুরগাঁওয়ে নয়, পুরো দেশে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ায় এবার পাল্টে গেছে নির্বাচনি চিত্র। দীর্ঘদিন ধরে ঠাকুরগাঁও-১ আসনকে উত্তরাঞ্চলের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়। অতীতের প্রতিটি নির্বাচনে এই আসন ছিল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির ত্রিমুখী লড়াইয়ের মাঠ। তবে এবারের নির্বাচন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে— কারণ ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর নিষিদ্ধ হয়েছে আওয়ামী লীগের রাজনীতি। ফলে মাঠে এখন মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি এবং অন্যান্য ইসলামী দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই আসনে একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন। এবারেও এই আসনে প্রার্থিতা ও বৈধ মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। তিনি শুধু ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের কাছে প্রিয় ব্যক্তিত্ব নন, তিনি পুরো দেশের মানুষের কাছেও জনপ্রিয় একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি। ইতোমধ্যে তিনিও নির্বাচনি মাঠে সরব হয়ে উঠেছেন। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার আগে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে ভোট ও দোয়া চেয়েছেন।

অন্যদিকে, সাবেক ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগরের শূরা সদস্য দেলাওয়ার হোসেন এবার নতুন মুখ হিসেবে মাঠে নেমেছেন। দলীয় ও নির্বাচন কমিশনের বৈধ মনোনয়ন পেয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনিও নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার আগে দলীয় ব্যানারে— জনসংযোগ ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে সামনে রেখে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন।

এ ছাড়াও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের জোটে যাওয়ার কথা থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্তে এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। সেই প্রেক্ষাপটে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের ঠাকুরগাঁও জেলার সহ-সভাপতি ডা. হাফেজ মো. খাদেমুল ইসলাম এই আসনে লড়বেন। তিনিও দল ও নির্বাচন কমিশনের বৈধ মনোনয়ন পেয়েছেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনীতি ও জীবন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জন্ম ও শিক্ষা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৬ জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মির্জা রুহুল আমিন ও মাতা মির্জা ফাতেমা আমিন। শিক্ষাজীবনে মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবন

১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। অন্যান্য সরকারি দায়িত্বের মধ্যে মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদফতরে একজন নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। বারী পদত্যাগ করার পর মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। এ সময় তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন।

রাজনৈতিক জীবন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (অধুনা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) একজন সদস্য ছিলেন এবং সংগঠনটির এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।

১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন এবং সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচনে অংশ নিয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যখন দেশব্যাপী আন্দোলন চলছিল, তখন মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

সংসদ নির্বাচন ও মন্ত্রিত্ব

মির্জা ফখরুল ১৯৯১ সালে পঞ্চম ও ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নিয়ে যথাক্রমে ৩৬,৪০৬ ও ৫৮,৩৬৯ ভোট পান এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থী খাদেমুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ১,৩৪,৯১০ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর নভেম্বরে বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।

মির্জা ফখরুল ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরাজিত হন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই সঙ্গে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন লাভ করেন এবং বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে শপথ গ্রহণ না করায় নির্বাচন কমিশন তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করে এবং সেখানে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বিএনপির মহাসচিব

২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে নির্বাচিত হন। এই পদে এর আগে তারেক রহমান বহাল ছিলেন। একই সম্মেলনে তারেক রহমান দলের ভাইস চেয়ারম্যানের পদ লাভ করেন। একই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং মির্জা ফখরুল বিরোধী দলীয় মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমে পরিচিতি পান।

২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করার পর দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতা এই মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কেউ কেউ বলেন, বিএনপির সংবিধানে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের কোনো বর্ণনা নেই। তবে বেগম খালেদা জিয়া ২১ মার্চ ২০১১ তারিখে সৌদি রাজপরিবারের আমন্ত্রণে সৌদি আরব যাওয়ার আগমুহূর্তে মির্জা ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করলে এ বিষয়ে বিভ্রান্তির অবসান ঘটে। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন।

তিনি বিগত সরকারের সময়ে বহু আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেন। এতে তিনি বহু মামলায় দীর্ঘ বছর কারাবাস করেন। 

ক্ষমতায় এলে ঠাকুরগাঁওয়ের সার্বিক উন্নয়নসহ বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা পুরোপুরি বাস্তবায়ন, শিক্ষা ও চিকিৎসার উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অঙ্গীকার করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বলেছেন, এটাই হয়তো তার জীবনের শেষ নির্বাচন; তাই আগামীর বাংলাদেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও উন্নত দেশ গড়তে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একত্রিত হয়ে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

দেলাওয়ার হোসেনের রাজনীতি ও সামাজিক জীবন

দেলাওয়ার হোসেন বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি। বর্তমান স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে যখন দুর্বার ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেই আন্দোলনের সরাসরি নেতৃত্ব দেন দেলাওয়ার হোসেন। এ জন্য তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। দিনের পর দিন স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা পুলিশের রিমান্ডের নামে চরম নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ বছর তাকে কারাগারে কাটাতে হয়েছে।

জন্ম ও পারিবারিক জীবন

১৯৮২ সালের ১৫ মার্চ ঠাকুরগাঁও সদরের দানার হাট এলাকার সৈয়দপুর গ্রামে মা তৈয়বা খাতুনের কোলে জন্ম নেন এই সাহসী ছাত্রনেতা। তার পিতার নাম আব্দুল কাদের। তিনি ১৯৯৭ সালের ২৭ মে ইন্তেকাল করেন। জন্মের পর থেকে এই সৈয়দপুর গ্রামেই বেড়ে ওঠেন দেলাওয়ার হোসেন।

শিক্ষাজীবন

দেলাওয়ার হোসেন শালের হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। সেখান থেকে পঞ্চম শ্রেণি শেষ করে বালাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৯৮ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনা করেন। বিজ্ঞানের ছাত্র দেলাওয়ার হোসেন ২০০০ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ঢাকায় বাংলাদেশ ইসলামী ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন।

রাজনৈতিক জীবন

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ২০১২-১৩ সেশনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রশিবিরের সভাপতি পদ থেকে বিদায় নেওয়ার পর ২০১৪ সালের ২৭ জানুয়ারি কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। বর্তমানে তিনি জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য।

পেশা

দেলাওয়ার হোসেন একজন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন জানান, এই আসনের মানুষ এবার তাকেই বেছে নেবেন বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং প্রতিযোগী হিসেবে দেখেন। জামায়াত ক্ষমতায় এলে দুর্নীতিমুক্ত দেশ ও আধুনিক ঠাকুরগাঁও গঠনে কাজ করবেন। নির্বাচনে জয়-পরাজয় যাই হোক, মানুষের চাওয়া-পাওয়া বাস্তবায়নে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন। তার মতে, তিনি মানুষের শাসক নন, সেবক হতে চান।

ডা. হাফেজ মো. খাদেমুল ইসলাম এর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন

অন্যদিকে নির্বাচনের আরেক নতুন মুখ বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের ঠাকুরগাঁও জেলার সহ-সভাপতি হাফেজ ডা. খাদেমুল ইসলাম। যদিও তিনি ছাত্রজীবন থেকেই ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম, দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা এবং সামাজিক ও ইসলাম প্রচারের কাজে সক্রিয় ছিলেন। তবে এবার দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচনি মাঠে তিনি একেবারেই নতুন মুখ।

জন্ম

ডা. হাফেজ মো. খাদেমুল ইসলাম এক সম্ভ্রান্ত ধার্মিক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৫ ডিসেম্বর ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের সাসলা পিয়ালা গ্রামের বুড়ির হাট সংলগ্ন এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম এছাম উদ্দীন ছিলেন একজন দ্বীনদার ব্যক্তি। তিনি দীর্ঘদিন মসজিদের ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিলেন এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন।

শৈশব ও শিক্ষা

শৈশব থেকেই ডা. হাফেজ মো. খাদেমুল ইসলাম ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। তিনি বাড়ির পাশের বুড়ির হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে বুড়ির হাট উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। এ সময় তিনি জামিয়া কাছিমিয়া মোস্তাফানগর কওমি মাদ্রাসা থেকে পবিত্র কুরআনের হিফজ সম্পন্ন করেন এবং কিতাব বিভাগে অধ্যয়ন শুরু করেন। এরপর তিনি পীরগঞ্জ পীরডাঙ্গী সিনিয়র ফাযিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।

চিকিৎসা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ থেকে তিনি পঞ্চগড় হোমিও মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ডিএইচএমএস (DHMS) ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করেন।

কর্মজীবন

ডা. হাফেজ মো. খাদেমুল ইসলাম দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি জামিয়া কাছিমিয়া মোস্তাফানগর কওমি মাদ্রাসার হিফজ বিভাগে খেদমত করেন। এ ছাড়া তিনি খামার ভপলা দাখিল মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বুড়ির হাট বাজারে একজন স্বনামধন্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষা, চিকিৎসা ও সমাজসেবার সমন্বয়ে গঠিত তার জীবনধারা এলাকার মানুষের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক জীবন

২০০৬ সালে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। এই ধারাবাহিকতায় ২০০৯-২০১০ সালে তিনি সদর উপজেলার ৬ নম্বর আউলিয়াপুর ইউনিয়নে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সেক্রেটারি হিসেবে তিন বছর এবং ২০১৯-২২ সাল পর্যন্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্বে আছেন।

নির্বাচন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশ এখন ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে তাকিয়ে আছে, যেহেতু এটি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এলাকা। তিনি দলমত নির্বিশেষে একজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। পাশাপাশি নির্যাতিত ছাত্রশিবির নেতা দেলাওয়ার হোসেনও মানুষ হিসেবে ভালো। এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ও প্রতিযোগিতা করা আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়।

তিনি আরও বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, কৃষির উন্নয়ন, শিক্ষা, বিমানবন্দর চালু, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকার, শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমার অঙ্গীকার। ইসলামী আন্দোলন ইসলাম, আদর্শ ও মানবতার কাজ করে যাচ্ছে। মানুষ যদি দলের নীতি ও আদর্শ বুঝতে পারে, তাহলে তারা অন্য প্রার্থীদের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন। ইসলামী আন্দোলন যেমন ইসলামকে লালন করে, তেমনি দেশকেও ভালোবাসে— তাদের দেশপ্রেম অন্যদের তুলনায় অনন্য।

স্থানীয় ভোটার নিশাত তাসিম, রেজু হাসান, বজলুর রহমান, মাসুকুল আলম, রিফাত, রোহান ও জহির বলেন, এখন রাজনীতির চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। মানুষ আর শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা নিরাপত্তা ও সুশাসনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যিনি এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারবেন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন উপহার দিতে পারবেন, ভোটাররা তাকেই সমর্থন দেবেন।

তারা আরও বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনি মাঠে না থাকায় ঠাকুরগাঁও-১ আসনে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং ভোটারদের সামনে বিকল্প নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের ভোটই এবার ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। তাদের ভাষায়, তরুণরা এবার আবেগ নয়, যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে ভোট দেবে।

স্থানীয় ভোটার মাহামুদা মুন্না বলেন, আগে ভোট মানেই ছিল সংঘাতের ভয়। তবে এখন সবাই আশা করছে এবারের নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে। তিনি জানান, ভোটাররা চাইছেন ভোটের দিন যেন কোনরকম সহিংসতা না ঘটে এবং সবাই নিরাপদে ভোট দিতে পারে।  

ভোটারদের মতে, এবার ঠাকুরগাঁও-১ আসনে লড়াই হবে জনপ্রিয়তা, সততা ও নেতৃত্বগুণের ওপর ভিত্তি করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দেলাওয়ার হোসেনের তরুণ প্রভাব— দুজনই ভোটারদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে এ ছাড়াও আলোচনায় রয়েছেন হাফেজ ডা. খাদেমুল ইসলাম। 

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের মানুষের সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এক আত্মার সম্পর্ক রয়েছে। তাই এই আসনে নির্বাচনি প্রচারণায় তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ— এমন কেউ নেই, যিনি তাকে চেনেন না। এলাকার সংখ্যালঘু ভোটাররাও কখনো সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে ছিলেন না। ফলে সাম্প্রদায়িক দলগুলো সংখ্যালঘু ভোট তেমনভাবে টানতে পারবে না। এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটের একটি বড় অংশ বিএনপির পক্ষে যাবে বলে মনে করেন জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমীন।

জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার- ৫ লাখ ৪ হাজার ৮৩৮ জন। তার মধ্যে নারী ভোটার- ২ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৮ জন, পুরুষ ভোটার-২ লাখ ৫১ হাজার ১৯৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ ৪ জন। নতুন ভোটার ২৪ হাজার ২৩৪ জন। 

অতীত নির্বাচনের ইতিহাস

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিগত সংসদ নির্বাচনে জয়ী সংসদ সদস্যরা হলেন— ১৯৮৬: খাদেমুল ইসলাম (জাতীয় পার্টি), ১৯৮৮: রেজওয়ানুল হক ইদু চৌধুরী (জাতীয় পার্টি), ১৯৯১: খাদেমুল ইসলাম (আওয়ামী লীগ), ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি): মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বিএনপি), ১৯৯৬ (জুন): খাদেমুল ইসলাম (আওয়ামী লীগ), ১৯৯৭ (উপ-নির্বাচন): রমেশ চন্দ্র সেন (আওয়ামী লীগ), ২০০১: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বিএনপি), ২০০৮: রমেশ চন্দ্র সেন (আওয়ামী লীগ), ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪: রমেশ চন্দ্র সেন (আওয়ামী লীগ, বিতর্কিত নির্বাচন)।

রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে, পাল্টেছে ক্ষমতার কেন্দ্রও। তবে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের মানুষ এখন চায় স্থিতিশীলতা, কাজের সুযোগ ও শান্তি। এই আসনে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবেন— তা জানতে অপেক্ষা ভোটের দিনের।

প্রতিনিধি/এফএ