images

সারাদেশ

কেমন নেতৃত্ব চান ঠাকুরগাঁওয়ের নারীরা? 

জেলা প্রতিনিধি

১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৭ এএম

নারী-পুরুষের সমান অধিকার, নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন—এই মৌলিক চাহিদাগুলো বাস্তবায়নের প্রত্যাশা নিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের মতামত তুলে ধরছেন ঠাকুরগাঁওয়ের নারীরা। তরুণী নতুন ভোটার থেকে শুরু করে গৃহিণী, শ্রমজীবী নারী, উদ্যোক্তা, জনপ্রতিনিধি ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে হলে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল, মানবিক ও নারীবান্ধব নেতৃত্ব।

দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত নানা বৈষম্য এবং প্রতিশ্রুতির রাজনীতির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন ঠাকুরগাঁওয়ের নারীরা। তারা জানান, অতীতের নির্বাচনগুলোতে ইচ্ছা থাকলেও সুষ্ঠুভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি অনেকে। তবে এবারের নির্বাচনী পরিবেশ তুলনামূলক ভালো হওয়ায় ভোট দিতে আগ্রহী তারা। একইসঙ্গে তাদের প্রত্যাশা, ভোটের আগে দেওয়া অঙ্গীকার যেন ভোটের পর বাস্তবে রূপ নেয়।

প্রথম ভোট ঘিরে তরুণী ভোটারদের আশা ও প্রত্যাশা:

তরুণী নতুন ভোটারদের মধ্যে এবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে নতুন এক আশাবাদ। তারা বলছেন, আগের নির্বাচনগুলোতে চাইলেও স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেননি। তবে এবার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় তারা ভোট দেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ও উৎসাহী। তরুণীদের মতে, শুধু আশ্বাস নয় নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বাস্তব কাজ করবেন এমন প্রার্থীই তাদের পছন্দ।

ঠাকুরগাঁও শহরের বাসিন্দা জান্নাত, বর্তমানে ঢাকা হলি ফ্যামেলি রেডক্রিসেন্ট নার্সিং কলেজে পড়াশোনা করছেন, তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, “আমি এর আগে জাতীয় কোনো নির্বাচনে ভোট দেইনি। এবার জাতীয় নির্বাচনে প্রথম ভোটার আমি। তরুণ-তরুণীরা চাই আমাদের প্রথম ভোটটা আনন্দ ও উৎসবের মধ্যে দিতে। এর আগে এমন ভোটের পরিবেশ ছিল না। অন্যান্য নির্বাচনে আমরা ভোট দিতে চাইলেও সুষ্ঠুভাবে দিতে পারিনি, কারণ পরিস্থিতি তেমন ছিল না। এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভালো মনে হচ্ছে, তাই আমরা ভোট দিতে আগ্রহী এবং আমাদের মাঝে একটা আনন্দ বিরাজ করছে।”

একই অনুভূতির কথা জানান ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের অর্নাস দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান নেহা। তিনি বলেন, “এবার আমার জীবনের প্রথম ভোট। এর আগে কখনও ভোট দেওয়া হয়নি। ইচ্ছা আছে এবার ভোট দেব। তবে আমি চাই এমন প্রার্থী, যিনি আমাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করবেন। অনেকেই অনেক প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন করেন না। তাই এবার আমরা সেই ধরনের প্রার্থীকে ভোট দেব, যিনি আমাদের শিক্ষা, নারীদের উন্নয়ন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নে কাজ করবেন।”

নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার সাধারণ নারীদের বড় দাবি: 

শুধু ভোটাধিকার নয়, জানমালের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারকেও নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে দেখছেন সাধারণ নারী ও গৃহিণীরা। তারা বলছেন, বর্তমান সময়ে চুরি, ডাকাতি ও বিভিন্ন অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

সাধারণ নারী ও গৃহিণী মোছা. ফুলজান বেগম বলেন, “আমরা গ্রামমুখী মানুষ, অনেকে ইউনিয়নে বাস করি। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে চুরি, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়ে গেছে। আমরা চাই এমন একজন ব্যক্তি ক্ষমতায় আসুক, যিনি আইনশৃঙ্খলা ও জানমালের নিরাপত্তা দিবেন, গরিব-দুঃখীর কথা শুনবেন এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।”

শ্রমজীবী নারীদের ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন:

কর্মক্ষেত্রেও প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন নারীরা। বিশেষ করে শ্রমজীবী নারীরা। তারা জানান, মাঠে একই কাজ করেও নারীরা পাচ্ছেন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা মজুরি, যেখানে পুরুষরা পাচ্ছেন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এই বৈষম্যকে অমানবিক উল্লেখ করে তারা বলেন, সমান কাজে সমান মজুরি ও নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে—এমন সরকারই তাদের প্রত্যাশা।

নারী শ্রমিক ও গৃহিণী মোছা. বৃষ্টি আক্তার, রাবেয়া খাতুনসহ অনেকে বলেন, “আমরা নারীরা সারাদিন মাঠে কাজ করে পাই মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, আর পুরুষরা পাচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। তাই আমরা এমন একটি সরকার চাই, যারা নারী-পুরুষের সমান অধিকার দেবে, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য দেবে এবং ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়বে।”

সুষ্ঠু নির্বাচন ও নারীবান্ধব উন্নয়নের দাবি জনপ্রতিনিধিদের:

নারীদের উন্নয়ন ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সুষ্ঠু নির্বাচনকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন নারী জনপ্রতিনিধিরা। তারা বলেন, যিনি নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তাকে অবশ্যই নারীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

সদর উপজেলার ৩ নম্বর আকচা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান শিমলা রায় বলেন, “আমরা সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন চাই। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে যিনি নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তিনি যেন নারীদের বেশি অগ্রাধিকার দেন এবং নারীদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে কাজ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ান।”

উদ্যোক্তা ও কর্মজীবী নারীদের বাস্তব সংকট:

উদ্যোক্তা ও কর্মজীবী নারীরাও তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তারা জানান, ব্যবসা শুরু করতে ঋণ পেতে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে সন্ধ্যার পর চলাচলে নিরাপত্তাহীনতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সীমিত আয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে।

উদ্যোক্তা ও কর্মজীবী নারী মোছা. উম্মে হানী, মনিষা রাণী ও নাজমুন নাহার বলেন, “আমাদের মেয়েদের চলার অধিকার ও চলাচলের নিরাপত্তা দরকার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সীমিত আয়ে সংসার চালানো কঠিন। এসব সমস্যা সমাধানে চলাচলের স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান ও সহজ ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে এমন সরকারই আমরা চাই।”

নারীর অধিকার:

নারীর অধিকার কেবল একটি শ্রেণির বিষয় নয়। এটি সার্বজনিক মানবাধিকার বলে মনে করেন নারী শিক্ষিকা ও মানবাধিকারকর্মীরা।

ঠাকুরগাঁও কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা, মানবাধিকার ও সংস্কৃতিকর্মী আফরোজা রিকা ঢাকা মেইলকে বলেন, “সমাজে এখনও নারীরা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। শুধু নারী-পুরুষ নয়, সব শ্রেণির মানুষের মধ্যকার বৈষম্য দূর করতে হবে। শহর বা গ্রাম, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত । সব ধরনের নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারবে—এমন গণতান্ত্রিক সরকার প্রত্যাশা করি আমরা।”

প্রত্যাশা একটাই— কথায় নয়, কাজে প্রমাণ:

নারীর অধিকার ও সমতার প্রশ্ন আর শুধু প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না ঠাকুরগাঁওয়ের নারীরা। ভোটাধিকার থেকে শুরু করে নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তাসহ সবকিছুর বাস্তব প্রতিফলন চান তারা। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের প্রত্যাশা একটাই—এমন একটি নেতৃত্ব, যারা কথা নয়, কাজে প্রমাণ করবে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার।

প্রতিনিধি/আরআর