জেলা প্রতিনিধি
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১৮ এএম
অসংখ্য নদনদীতে ভরা ঐতিহ্যবাহী জেলা মাদারীপুর। পদ্মা নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে পদ্মা সেতু। অথচ পদ্মা সেতুকে কাজে লাগিয়ে আজও গড়ে উঠেনি একটিও কলকারখানা কিংবা শিল্প প্রতিষ্ঠান। মেডিকেল কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি দীর্ঘদিনেও। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নতিকরনের দাবিও রয়ে গেছে আশ্বাসের বানীতেই। আর অন্ধকারেই ঢাকা স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অব্যবস্থাপনা, নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘসূত্রিতা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে কোনো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি এই জেলায়।
জানা যায়, পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, কুমারসহ অসংখ্য নদনদী বিশিষ্ট মাদারীপুর জেলা। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও জেলায় আজও গড়ে উঠেনি কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান কিংবা কলকারখানা। আত্মকর্মসংস্থান না হওয়ায় বাড়ছে হতাশা। শিল্প মন্ত্রনালয়ের অর্থায়নে ৬১ কোটি টাকা ব্যয় করে বিসিক শিল্প নগরী সম্প্রসারণ করা হলেও ভূমি উন্নয়ন, পানি সরবরাহ, পয়নিষ্কাশন, গ্যাস সংযোগসহ ব্যবসায়িক পরিবেশ না থাকায় তৈরি হয়নি নতুন উদ্যোক্তা। ফলে এ জেলায় বিনিয়োগ করেননি কোনো ব্যবসায়ী। তাই প্রসার হয়নি ব্যবসা-বাণিজ্যের।

তথ্য বলছে, ১১২৫ দশকি ৬৯ বর্গকিলোমিটারের তিনটি সংসদীয় আসনের এই জেলায় মোট ভোটার ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৭২ জন। যার অর্ধেকেই নারী। অথচ, নেই নারীদের উন্নয়নেও কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের দাবি ছিল বেশ জোড়ালো, সেই প্রত্যাশাটুকুও হয়নি পূরণ। ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা ২৫০ শয্যার জেলার আধুনিক হাসপাতালও মৃত প্রায়। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় নেই কাঙ্ক্ষিত সেবা। একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের স্বপ্নপূরণ রয়েছে গেছে অন্ধকারেই।
এদিকে, ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলেও শতভাগ সুফল পাচ্ছেন না দক্ষিণাঞ্চলবাসী। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুরের ৪৫ কিলোমিটার অংশে ঝুঁকি কাটেনি আজও। বড় বড় গর্ত আর খানাখন্দে ভরা এই সড়কে দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে সড়কটি ৬ লেনে উন্নতিকরনের দাবি জানানো হলেও তা শুধু সীমাবদ্ধ আশ্বাসের বানীতেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অব্যবস্থাপনা, নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘসূত্রিতা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি এই জেলায়।

সবশেষ ২০২২ সালের ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র’ অনুযায়ী দেশের দরিদ্র এই জেলার বার বারই রয়ে গেছে উন্নয়নে পিছিয়ে। দারিদ্র্যের চিহ্ন লেগে আছে শহর থেকে গ্রাম সবখানেই। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলানোর কারিগররা রয়ে গেছে অবহেলিত। তাই তো হয়নি কৃষকদের ভাগ্যের পরিবর্তন। আর ইতিহাস-ঐহিত্যের এই জেলায় বিনোদন খাতেও আসেনি আমুল পরিবর্তন।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক, নারীদের উন্নয়ন, কিংবা যুবকের কর্মসংস্থান, সবকিছুতেই পিছিয়ে রয়েছে মাদারীপুর জেলা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সব সমস্যার দ্রুত সমাধান করবে নতুন সরকার এমনটাই প্রত্যাশা জেলাবাসীর।
মাদারীপুর সরকারি কলের শিক্ষার্থী সাথী আক্তার বলেন, জেলায় নেই কোনো মেডিকেল কলেজ কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এটি দ্রুত স্থাপনের দাবি জানাচ্ছি। এই দাবি ছিল দীর্ঘদিনের সেটি পূরণ না হওয়ায় আমরা লজ্জিত।

মাদারীপুরচেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি পরিচালক মর্তুজা ঢালী বলেন, কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিসিক শিল্প নগরী সম্প্রসারণ করা হয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগের কোনো আগ্রই নেই। এজন্য পরিকল্পনার অভাবই একমাত্র কারণ। পদ্মাসেতুর সুফলকে কাজে লাগিয়ে কলকারখানাও গড়ে উঠতে পারেনি। এটা জেলাবাসীর জন্য দুঃখজনক। কলকারখানা হলে বেকারক্ত দূর হতো, মানুষের জীবনযাত্রার মানেরও পরিবর্তন হতো।
মাদারীপুরের নিরাপদ চিকিৎসা চাই-এর সভাপতি অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান পারভেজ বলেন, বড় বড় হাসপাতাল নির্মাণ করলেই সেবার মান পরিবর্তন হয় না। ভবনের সঙ্গে জনবলও নিয়োগ দেওয়াটার দরকার। ২৫০ শয্যা হাসপাতাল আছে, কিন্তু নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। এই জনবল নিয়োগ না দিতে পারাটা সংসদ সদস্যদের একটু বড় দুর্বলতা ছিল, যা দায়িত্ব অবহেলার মধ্যেও পড়ে। আগামীতে এই প্রত্যাশার পূরণ হবে সেটাই আশা করছি।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি খান মোহাম্মদ শহীদ বলেন, যোগাযোগ খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আশা করেছিল জেলাবাসী। কিন্তু সেই প্রত্যাশাটুকু পূরণ হয়নি। এজন্য অব্যবস্থাপনা, নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘসূত্রিতা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণই দায়ী।
প্রতিনিধি/টিবি