images

সারাদেশ

নেত্রকোণায় ট্রাকের ধাক্কায় আহত বিপন্ন প্রজাতির গন্ধগোকুল উদ্ধার

জেলা প্রতিনিধি

১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম

নেত্রকোণা সদর উপজেলায় ট্রাকের ধাক্কা খেয়ে একটি বিপন্ন প্রজাতির গন্ধগোকুল সড়কের পাশে পড়েছিল। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে বন বিভাগের লোকজন প্রাণীটি উদ্ধার করে। বর্তমানে জেলা বন বিভাগে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গতকাল শনিবার রাত ১১টার দিকে নেত্রকোণা-মোহনগঞ্জ সড়কের সদর উপজেলার সতরোশ্রী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী, বন বিভাগের লোকজন ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার রাত ১০টার দিকে নেত্রকোণা-মোহনগঞ্জ সড়কের সতরোশ্রী এলাকায় একটি গন্ধগোকুল রাস্তা পার হওয়ার সময় নেত্রকোণা থেকে মোহনগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া মালভর্তি ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে। পরে স্থানীয় লোকজন সেখানে ভিড় জমায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রাণীটিকে চিতা বাঘ আখ্যা দিয়ে লাঠি দিয়ে মেরে ফেলতে চাইলে উপস্থিত অনেকেই বাধা দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শী জামিয়া ইসলামিয়া রেজভিয়া সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. এরশাদ উদ্দিন বলেন, শনিবার রাত ১০টার দিকে ট্রাকের ধাক্কা খেয়ে প্রাণীটি সড়কের পাশে পড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করছিল। পরে আমরা সেখানে গিয়ে দেখি কয়েকজন যুবক লাঠি নিয়ে এসে এটিকে মেরে ফেলতে চাইছিল। আমরা তাদের বুঝিয়ে শান্ত করে প্রশাসন ও বন বিভাগকে খবর দেই। পরে রাত ১১টার দিকে বনবিভাগের লোকজন প্রাণীটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়। গন্ধগোকুলটি বেশ বড় হওয়ায় এটি দেখতে বাঘের মতো। ট্রাকের ধাক্কা লেগে মুখ ও মাথায় বেশি আঘাত পেয়েছে।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ঠাকুরাকোনা ইউপি পরিষদের সদস্য আতিকুর রহমান বলেন, গন্ধগোকুলটি আকারে বেশ বড়। শরীরের দাগ দেখে স্থানীয় কেউ একে চিতা বাঘ, কেউ বাগডাশ বলে পিটিয়ে মেরে ফেলতে চাইছিল। তবে বাধা দেওয়ায় কেউ আঘাত করেনি। নিশাচর প্রাণী হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, রাতে খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে এটি আহত হয়েছে।

Gokul1

আজ দুপুরে শহরের জয়নগর এলাকায় বন বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে একটি লোহার খাঁচায় প্রাণীটি রাখা হয়েছে। মুখ ও মাথায় ক্ষতস্থানে চিকিৎসা দিচ্ছেন জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেনারি চিকিৎসক মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল। মিজানুর রহমান বলেন, প্রাণীটির মুখ, জিহ্বা ও মাথায় সিরিয়াস ইনজুরি রয়েছে। বলা যায়  সংকটাপন্ন। মাথার কিছুটা অংশ দেবে গেছে, জিহ্বার আংশিক কাটা পড়েছে। পর্যবেক্ষণে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠালে ভালো হয়।

জানতে চাইলে নেত্রকোণা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন এলাহি বলেন, লেজসহ এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ সেন্টিমিটার, উচ্চতা তিন ফুটের মতো এবং ওজন ৫ কেজির মতো। গন্ধগোকুলটির চিকিৎসা চলছে। সুস্থ হয়ে উঠলে এটিকে আবার বনে অবমুক্ত করা হবে।

তিনি আরও বলেন, আপাতত উন্নত চিকিৎসার জন্য কোথাও পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আর ময়মনসিংহেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা উন্নত চিকিৎসার সুযোগ নেই। তাই এখানেই রাখা হবে।

স্থানীয় বন্য প্রাণী গবেষক অধ্যাপক নুরুল বাসেত জানান, গন্ধগোকুল একটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। ২০০৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) প্রাণীটিকে ‘বিপন্ন’ তালিকাভুক্ত করে। বাংলাদেশে ২০১২ সালের বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুযায়ীও এটি সংরক্ষিত প্রাণী। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই প্রজাতি পাওয়া যায়। শত্রু দেখলে প্রাণীটি একধরনের কাঁদানে গ্যাস স্প্রে করে, যা আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে কাজ করে। নিরীহ স্বভাবের এই প্রাণীকে গন্ধগোকুল, ছোট বাগডাশ, ছোট খাটাশ, গন্ধগুলা, হাইলটালা ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। আয়ুষ্কাল প্রায় ১৫ বছর। এরা ঝোপঝাড়, বাগান ও ঘরের ছাদে বাসা বাঁধে। ধানখেতের ইঁদুর, গেছো ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, পাখি, ডিম, ব্যাঙ, শামুক ও ফল খায়। তাল-খেজুরের রস এদের প্রিয় খাদ্য। বছরে অন্তত দুবার ছানা দেয়।

প্রতিনিধি/এফএ