images

সারাদেশ

পদ্মা পাড়ে পর্যটনের দুয়ার খুলতে বড় বাধা- সময়োপযোগী উদ্যোগ

জেলা প্রতিনিধি

০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:০৮ পিএম

পদ্মা সেতু, ইলিশ আর মুক্ত দক্ষিণা বাতাস, আপন গতিতে অনাবিল মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে পদ্মা পাড়ে, যা দিন দিন আকৃষ্ট করছে পর্যটকদের। ফলে ইট, পাথরের কর্মব্যস্ত, কংক্রিটের নগরী রাজধানী ছেড়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিন কিংবা বিশেষ দিনে মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তের পুরাতন শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকায়।

অন্যদিকে, পদ্মা সেতুর প্রকল্প রক্ষা বাঁধের তীর ঘেঁষে, সকালে সূর্যোদয় কিংবা বিকেলে সূর্যাস্ত সবকিছুই যেন একই স্থানে, কাছ থেকে দেখা মিলছে পদ্মা পাড়ের নির্মল স্নিগ্ধতার মধ্য দিয়ে। এতে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ইঞ্জিন চালিত ট্রলারে কিংবা প্রমদতরীতে ভ্রমণ।

সরজমিনে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার সকালে শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পর্যটকদের পদ্মার তাজা ইলিশের তৃপ্তি দিতে মাওয়া প্রান্তে গড়ে উঠেছে প্রায় দুই শতাধিক ছোট বড় খাবার হোটেল। এছাড়া রয়েছে প্রমদতরীতে বিলাসীভাবে ইলিশ ভোজনের ব্যবস্থা।

thumbnail_IMG-20260102-WA0201

পাশাপাশি পদ্মা পাড়ে তীর ঘেঁষে, গড়ে উঠেছে বহু ভাসমান হোটেল, যেখানে আনাগোনা বেড়েছে পর্যটকদের।

তবে অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত যাত্রী ছাউনি, গাড়ি পার্কিং সুবিধা ও পরিচ্ছন্ন টয়লেট না থাকায়। প্রায়ই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পদ্মা পাড়ে ছুটে আসা পর্যটকদের। ফলে পর্যটন সম্ভাবনা ধরে রাখতে, সময়োপযোগী উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে সরজমিনে আরও দেখা গেছে, দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ইঞ্জিনচালিত ট্রলার কিংবা প্রমদতরীতে পদ্মা ভ্রমণে, পর্যটকদের জন্য নেই লাইভ জ্যাকেট অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো উপায়। 

এদিন পর্যটন ও যাত্রীদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য টুরিস্ট ও নৌ পুলিশের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকায়।

thumbnail_IMG-20260102-WA0164

মাওয়া প্রান্তে ঘুরতে আসা পর্যটকদের অভিযোগ রয়েছে, তদারকি না থাকায় পদ্মা নদীতে ঘুরাতে নিয়ে ফেরার পথে মাত্রা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয় সাধারণ পর্যটকদের কাছ থেকে, তবে এমন অভিযোগ স্বীকার না করলেও ঘাট এলাকায় বড় একটি সিন্ডিকেট চক্রের নিয়ন্ত্রণে এমন কর্মকাণ্ড চলছে বলে দাবি করেছেন, ইঞ্জিনচালিত ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি সিদ্দিক মন্ডল।

ঘাট এলাকায় দেখা গেছে, ৭০০ থেকে ১০০০ টাকায় ঘণ্টা ভিত্তিকে চুক্তিতে ইঞ্জিন চালিত ট্রলার ভাড়া করে, নদীতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মাওয়া প্রান্তে আগত দর্শনার্থীরা। পাশাপাশি বিভিন্ন ট্রলারে জনপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিয়েও পদ্মা ভ্রমণে অংশ নিচ্ছেন অনেকে। এছাড়া স্পিডবোটে ঘুরাতে জনপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা।

রাজধানীর গুলশান থেকে স্ত্রী ও দুই কন্যা সন্তান নিয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মাওয়া প্রান্তে ঘুরতে আসা এক ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুর রব দেওয়ান বলেন, একটু প্রশান্তির জন্য পদ্মা পাড়ে ঘুরতে এসেছি পরিবার নিয়ে। তবে এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো তদারকি নেই পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য। পাশাপাশি ইঞ্জিনচালিত ট্রলারগুলো যে যেভাবে পারছেন খেয়াল খুশি মতো সীমিত সময়ের জন্য পদ্মা নদীতে ঘুরিয়ে টাকা আদায় করছে পর্যটকদের কাছ থেকে, ফলে বিষয়টি নিয়ে তদারকি প্রয়োজন।

অন্যদিকে পৌষের কনকনেক শীত উপেক্ষা করে, সুদূর জার্মান থেকে দেশে ঘুরতে আসা এক প্রবাসী বাংলাদেশি রকি জ্যাকসন বলেন, বহির্বিশ্বের সৌন্দর্যের চাইতেও দেশের পদ্মা পাড়ের সৌন্দর্য বিমোহিত করেছে আমাকে, সপরিবারে, দেশে ফেরার আগেই ভেবে রেখেছিলাম পদ্মা পাড়ে আসব, পদ্মা সেতু দেখব, তাজা ইলিশের স্বাদ নেব, সেই ইচ্ছাটা পূরণ হয়েছে কিন্তু এখানকার কিছু বিষয়ে অব্যবস্থাপনায় আমরা অসন্তুষ্ট হয়েছি।

thumbnail_IMG-20260102-WA0195

মাওয়া প্রান্তে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে, পদ্মা পাড়ে একটি সুন্দর মুহূর্তের সাক্ষী হতে ঘুরতে আসা সদ্য বিবাহিত দম্পতি রহিমা আফরোজ ও প্রান্ত শেখের গল্পটা একটু ভিন্ন, পদ্মা পাড়ে সূর্যাস্তের সাথে নিজেদের সুন্দর মুহূর্তের ছবি মুঠোফোনে ধারণ করেছেন এই নবদম্পতি। তাদের দাবি, ঘাট এলাকায় যাত্রী ছাউনি কিংবা পরিচ্ছন্ন টয়লেট না থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তাদের।

এদিকে বিআইডব্লিউটিসি ও বিআইডব্লিউটিএসহ স্থানীয় জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ২২ জুন, পদ্মা পাড়ে পর্যটন হাব ও আন্তর্জাতিক কন্টেইনার পোর্ট নির্মাণের লক্ষ্যে, মুন্সিগঞ্জে ৫ উপদেষ্টার যৌথ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ওইদিন, উপদেষ্টাদের সভায়, ৭শ ৫৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে, ২৯ দশমিক ১৩ একর জায়গায় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার কথা জানানো হয়েছিল। এতে সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি, দেশ ও দেশের বাইরের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন নৌ-পরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। পাশাপাশি পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দিয়ে, শিমুলিয়া ঘাটে জেটি স্থাপন ও সার্বক্ষণিক একটি ফেরি চলাচলের ব্যবস্থা রাখা। পদ্মা সেতু ঘিরে পর্যটন হাব তৈরি করা এবং ইকো পোর্ট গড়ে তোলাসহ দশটি প্রকল্প বাস্তবায়নে মাস্টারপ্ল্যান তুলে ধরা হয়েছিল গণমাধ্যমে। তবে বছর ঘুরে নতুন বছর আসলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে নেয়া হয়নি দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের দাবি, উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশে নদী বাঁচাতে যুগোপযোগী উদ্বেগ নেওয়া না হলে, হুমকিতে পড়বে জীববৈচিত্র্য ও নদী কেন্দ্রিক মানুষের জীবন জীবিকা।

thumbnail_IMG-20260102-WA0170

এসব তথ্য নিশ্চিত করে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দ্রুত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তাগির দেওয়ার কথা জানিয়েছেন, মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী। তিনি বলেন, পদ্মা পাড়ে পর্যটন সম্ভাবনাময় অবস্থান ধরে রাখতে দ্রুত সময়োপযোগী উদ্বেগ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

ছবির ক্যাপশন: পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে পর্যটকদের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি ইঞ্জিন চালিত ট্রলার ও মানুষের ভিড়ের ছবিগুলো শুক্রবার সকালে শিমুলিয়া ফেরিঘাট থেকে তোলা- ঢাকা মেইল।

প্রতিনিধি/এসএস