images

সারাদেশ

চট্টগ্রামে কোথাও মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৪ এএম

চট্টগ্রামে কোথাও মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার। বিশেষ করে বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডার নেই বললেই চলে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা।

ভোক্তারা জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে বাজার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট চলছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকাল থেকে চট্টগ্রাম শহরে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি সিলিন্ডার।

শহরতলীর কিছু খুচরা বাজারে কয়েকটি সিলিন্ডার মিললেও দাম হাঁকা হচ্ছে দুই হাজার টাকারও বেশি। অথচ ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সরকার নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ২৫৩ টাকা।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পক্ষ থেকে বিষয়টিকে কৃত্রিম সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি কমে যাওয়ায় এলপিজি সংকট স্মরণকালের ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই সুযোগে তিন দফা দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি।

এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বাংলাদেশের সকল এলপি গ্যাস বিপণন ও সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এছাড়া সকল কোম্পানি প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।

তাদের দাবিগুলো হলো—বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) থেকে নতুন করে এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য সমন্বয় করতে হবে। কমিশন বাড়াতে হবে। প্রশাসন দিয়ে পরিবেশকদের হয়রানি ও জরিমানা বন্ধ করতে হবে।

ব্যবসায়ী সমিতির মতে, এলপিজি সংকট ঘুচিয়ে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশকে (লোয়াব) চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু এই চিঠির কোনো প্রভাবই বাজারে পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লোয়াবের প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক জানান, দেশের শীর্ষ কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে না পারায় ডিসেম্বরে আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়। নতুন করে কিছু কোম্পানি বটলিং ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির আবেদন করলেও সরকার অনুমোদন দিচ্ছে না। এতে করে সংকট তৈরি হয়েছে।

# খুচরায় বেশি দামে মিলছে শহরতলীর কিছু দোকানে

# আমদানি কমিয়ে দিয়েছে বেক্সিমকো-বসুন্ধরা-ইউনাইেটেড

# আন্দোলনে এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি

# ভোক্তাদের ভোগান্তি

তিনি বলেন, দেশের বড় কোম্পানিগুলোর কোটার এলপিজিগুলো আমরা আমদানি করতে চেয়েছিলাম। আমরা সরকারের কাছে চিঠি লিখেছি। কিন্তু আমাদেরকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমাদের অনুমতি দেওয়া হলে আজকের পরিস্থিতি হতো না। তবে সমস্যাটি ১০-১৫ দিনের মধ্যে কেটে যাবে বলে জানিয়েছেন লোয়াবের এই নেতা।

লোয়াবের দায়িত্বশীল সূত্রের মতে, বড় বড় বেশ কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। বিশেষ করে বেক্সিমকো, বসুন্ধরা, ইউনিটেঙের মতো বড় সরবরাহকারীরা আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখায় পরিবেশকরা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাচ্ছেন না। ফলে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার সংকট তীব্র হয়েছে। ভেঙে পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা।

চাহিদা ও যোগানের ব্যাপক পার্থক্যের কারণেই বাজারে এলপিজি সংকট তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করে লোয়াবের একাধিক সদস্য বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে বেশ কিছু জাহাজ এলপিজি পরিবহন করতে পারছে না। এতে করে গত ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। তাই সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের সংকট তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, এলপিজি ইচ্ছে করলেই আমদানি করা যায় না। সরকারের অনুমোদন পেতে হয়। সরকার আগে অনুমোদন দেয়নি। এখন দিয়েছে। অপরদিকে বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে বড় বড় কোম্পানিগুলোর ঝামেলা রয়েছে। তারা এলসি খুলতে পারছে না। ব্যাংক ফিন্যান্স না করলে এলপিজি আমদানি সম্ভব নয় বলেও তারা উল্লেখ করেন।

খুচরা ও পাইকারি এলপিজি বিক্রেতারা বলেন, কোম্পানিগুলো থেকে চাহিদার তুলনায় গ্যাস পাচ্ছেন খুব সামান্য। কোনো কোনো পরিবেশক সিলিন্ডারই পাচ্ছেন না। ফলে দোকান বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে। শহরতলীর কিছু খুচরা দোকানে অল্প কিছু এলপিজি সিলিন্ডার রয়েছে। ক্রেতারা সেখান থেকে যে যেভাবে পারছে এলপিজি সিলিন্ডার কিনে নিচ্ছে। সুযোগ বুঝে বিক্রেতারাও বেশি দাম আদায় করছে।

বিক্রেতাদের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম শহরে প্রতিদিন ৫০০-৭০০ এলপিজি সিলিন্ডারের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে মিলছে ১০০-১৫০ এলপিজি সিলিন্ডার। এতে চাহিদা মিটবে কি করে? এলপিজি সংকটের এই সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে মোটা অংকের ব্যবসা করছেন কিছু বিক্রেতা।

তারা সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে দোকান থেকে এলপিজি সিলিন্ডার সরিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০-৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম দিয়ে গত কয়েকদিন ধরে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। এই চক্রটি এলপিজি সংকটকে মহাসংকটে পরিণত করেছে বলেও সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।

নগরবাসীর মতে, দেশের বাসা বাড়িতে গ্যাস সংযোগ প্রদান বন্ধ থাকার প্রেক্ষিতে শহরের হাজার হাজার বাসা বাড়িতে এলপিজি ব্যবহৃত হয়। শত শত বহুতল ভবনে এলপিজিই একমাত্র ভরসা। ১২ কেজির সিলিন্ডার ব্যবহার করেই হাজার হাজার বাসা বাড়িতে রান্নাবান্না চলে।

এলপিজির অভাবে এখন এসব বাসার বাসিন্দাদের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। শুধু বাসাবাড়ি নয়, বহু হোটেল রেঁস্তোরাও এলপিজি দিয়ে রান্না করে। ঘরে এবং হোটেলে রান্না বন্ধ থাকলে মানুষ বাঁচবে কি করে বলেও তারা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।

চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রাসেল আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শহরের অসংখ্য দোকানে গিয়েও একটি সিলিন্ডার পাইনি। কোনো দোকানেই এলপিজি সিলিন্ডার নেই। টাকা দিয়েও মিলছে না এলপিজি। এতে পরিস্থিতি চরমভাবে নাজুক হয়ে গেছে। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নগরজীবন বিষিয়ে উঠবে। এলপিজির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে খুচরা ব্যবসায়ীরা ভোক্তাদের জিম্মি করে টাকা হাতানোর মিশনে নেমেছে বলেও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

চকবাজার খলিফাপট্টি এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, গত সপ্তাহে পুরো চট্টগ্রাম শহরের কত দোকানে যে গেছি তার ঠিক নেই, কিন্তু একটি সিলিন্ডারও পাইনি। শেষে কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে দুই হাজার টাকায় একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছি।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, এলপিজি আমদানিকারকেরা বিইআরসি-নির্ধারিত দামে ডিলারদের সরবরাহ করছে। তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকটকে পুঁজি করে কিছু করলে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।

প্রতিনিধি/টিবি