জেলা প্রতিনিধি
০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৭ এএম
উত্তরের বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে বেড়েছে শীতের প্রকোপ। দিনভর দেখা মিলছে না রোদের। এছাড়া বইছে বাতাস। ফলে দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীরা। তবে ফুটপাতে সপ্তাহ খানেক ধরে শীতের পোশাকের জমজমাট বেচাবিক্রি হচ্ছে।
প্রায় ৭২ ঘণ্টা পর বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুরে কয়েক মিনিটের জন্য রোদ ওঠে রাজশাহীর আকাশে। এর আগের তিনদিন দেখা মেলেনি সূর্যের। বুধবার বছরের শেষ দিন রাজশাহীতে মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করে আবহাওয়া অফিস। এদিন সকাল ৬টায় রাজশাহীর তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকাল ৬টায় রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ১০০ শতাংশ। অবশ্য বুধবার সকাল ৬টাতেও বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ১০০ শতাংশ।
আবহাওয়া অফিস থেকে জানা গেছে, মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া তার আগের দিন সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) সর্বনিম্ন ১২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এর আগে গত ২৫ ডিসেম্বর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
![]()
সরেজমিনে নগরীর সাহেব বাজার, রেলগেট, নিউ মার্কেট, গণকপাড়া, কুমারপাড়া, কোর্ট বাজার, রানীবাজারসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে ফুটপাতের দোকানে ভিড় দেখা গেছে। শীতের মোটা পোশাক কিনতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের সমাগম বেশি দেখা যায়। দাম দর করে শীতের জ্যাকেট, মাফলার, পাজামা, টুপি, কিনছেন তারা।
রশিদুল হক নামে এক ক্রেতা বলেন, সাহেব বাজার মার্কেটে গেছিনু, একটা জ্যাকেটের দাম ৯০০ ট্যাকা চাইলো, এঠি আইস্যা কিননু ৩০০ ট্যাকাট। ম্যালা কম দাম। জিনিস পরা লিয়্যা কথা, শীতে অত দামি কী কইরবো।
মোছা. হাফসা নামে এক নারী বলেন, বাচ্চার জন্য সোয়েটার কিনতে এসেছি। দেখছি ঘুরে, মার্কেটের চেয়ে ফুটপাতেই দাম কম, তাই পছন্দ হলে এখান থেকেই কিনবো।
রবিউল ইসলাম নামে একজন বলেন, আমরা গরিব মানুষ, এখানেই ভাল আমারে। কম দামে পাচ্ছি। এগুলাও ভাল পোশাক।
![]()
রাজু নামে এক বিক্রেতা বলেন, এক সপ্তাহ থেকে বেচাবিক্রি অনেক ভাল। আমরা কম লাভে বিক্রি করছি। আমার এখানে ২০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন দামের জিনিস আছে।
রাশেদ নামে আরেক বিক্রেতা বলেন, আমরা চাই শীত থাকুক, শীত থাইকলে বেচাবিক্রি ভাল হয়। লোকজন আইসছে। সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আমরা বিক্রি করছি।
তবে খেটে খাওয়া মানুষেরা পড়েছেন বিপাকে। বৃদ্ধ রিকশাচালক শরিফ বলেন, প্যাটে তো খাওয়া লাইগবে, সংসার আছে। বাঘা থাইক্যা আইস্যা রিকশা চালাচ্ছি। ম্যালা কষ্ট, কী কইরবো উপায় নাই। ইট্টু রোদ উঠলে তাও আরাম পাই। সেডাও নাই।
ইসরাফিল নামে চারঘাটের এক শ্রমিক দৈনিক রাজশাহী আসেন কাজের সন্ধানে। তিনি বলেন, ঠাণ্ডাত কোঁদাল হাতে নিতে পারি না। তাও আসা লাইগছে। শীত বেশি, সমিস্যা হচ্ছে। হলেও কাজ কইরবো, কিন্তু কাজ কম।
এদিকে, শীতের কারণে সন্ধ্যার পরপরই অনেক দোকান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। অনেক মার্কেটও ক্রেতাশূন্য হয়ে যাচ্ছে। শীতের প্রভাব পড়ছে নগরীর বিনোদনস্পটগুলোতে। নগরীর পদ্মা গার্ডেন, টি-বাঁধ, লালন শাহ মুক্তমঞ্চ ও ফুলতলাসহ বিভিন্ন স্পটে সরেজমিনে গিয়ে প্রায় ফাঁকা অবস্থায় দেখা গেছে। মুখরোচক খাবারের অস্থায়ী দোকানের চেয়ারগুলো প্রায় সবই ছিল ফাঁকা।
টি-বাঁধ এলাকার এক পেয়ারা বিক্রেতা বলেন, শীতের জন্য লোকজন কম। যারা আইসছে, সেলফি তুলে চলে যাচ্ছে। শীতের জন্য বসে খাওয়ার ইচ্ছা কম মানুষের। ব্যবসা বাণিজ্যর অবস্থা এখন ভাল না। অর্ধেকের চেয়েও কম হচ্ছে বিক্রি।
বিনোদনপ্রেমী পর্যটকরা পদ্মার পাড়ে গিয়ে নৌকাযোগে নদীর মাঝখানে এবং নদী পেরিয়ে চরাঞ্চলে ঘুরতে যান। সারাদেশ থেকে অনেকে পিকনিক করতে আসতেন, এতে নৌকার মাঝিদের ব্যবসা জমজমাট হয়। তবে শীতের কারণে তিন ভাগের একভাগও পর্যটক আসছেন না বলে নৌকার মাঝিরা জানিয়েছেন।
বিপ্লব নামে এক মাঝি বলেন, আগের ২ হাজার মানুষ নৌকায় চলাচল করতো দৈনিক। এখন ৫০০ লোকও হচ্ছে না। হাকডাক করে করেও লোক পাচ্ছি না। শীত বেশি আবার বাতাস, সেজন্য কে যাবে এরমধ্যে নদীতে ঘুরতে? তাই ব্যবসা ভাল হচ্ছে না।
![]()
তবে ঘুরতে আসা তরুণ-তরুণীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। টি-বাঁধ এলাকায় বান্ধবীদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে গেছিলেন কলেজছাত্রী সাইয়েদা খাতুন। তিনি বলেন, শীতের মধ্যে ঘুরতেও ভাল লাগে। বাসায় ভাল লাগছিল না, তাই চলে আসলাম নদীর পাড়ে। শীত অনেক, শীতে জমে যাচ্ছি আর এই তো সেলফি তুলছি।
নওগাঁর পত্মীতলা থেকে শিশুকে নিয়ে ঘুরতে এসেছেন সাইদুল নামে এক যুবক। তিনি বলেন, রাজশাহীতে শীত বেশি। মনে করেছিলাম কম হবে, কিন্তু বাচ্চাকে নিয়ে এসে কষ্টই হলো।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, তামপাত্রা কমেছে, সেই সঙ্গে বাতাসও আছে। এছাড়া রোদ উঠছে না, সেজন্য শীত বেশি মনে হচ্ছে। তবে এ অবস্থা আরও কয়েকদিন থাকবে। প্রয়োজন্য ছাড়া বাইরে না যাওয়া এবং প্রত্যেককে মোটা কাপড় ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
প্রতিনিধি/টিবি