জেলা প্রতিনিধি
৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:৩৮ পিএম
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি যেন ‘মৃত্যুর করিডোর’। চলতি বছরের গেল ১১ মাসে এ মহাসড়কে ১৫৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫০ জন আর আহত হয়েছেন ৩৫১ জন। এসব দুর্ঘটনার পেছনে অপ্রশস্ত সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, বেপরোয়া গতি, লবণাক্ততার কারণে পিচ্ছিল সড়ক, অবৈধ ও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর প্রেক্ষিতে এ মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণের দাবিতে রোববার ৩ ঘণ্টাব্যাপী চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করা হয়েছে।
রোববার (৩০ নভেম্বর) সকাল ১০টায় মহাসড়কের চকরিয়ার মাতামুহুরী সেতুটির দু’পাশে রশি দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক উন্নয়ন আন্দোলন নামের একটি সংগঠনের নামে জনতা এই ব্যারিকেড দেন।
সেতুটির ওপর ব্যানার, ফেস্টুন দিয়ে চলে মিছিল ও বিক্ষোভ। স্লোগানে স্লোগানে সড়কের একপাশ থেকে অন্য পাশে চলে শিক্ষার্থীদের মিছিল। শুধুমাত্র অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া যেতে দেওয়া হয়নি কোনো যানবাহনকে।
দুর্ভোগ এড়াতে এবং ব্যারিকেড তুলে নিতে ঘটনাস্থলে আসেন পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন। তারা শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়ার বিষয়গুলো শোনেন এবং ব্যারিকেড তুলে নেয়ার আহ্বান জানান। পরে দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা পর দুপুর ১টায় প্রশাসনের আশ্বাসে ব্লকেড কর্মসূচি স্থগিত করে আন্দোলনকারীরা।
সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়ক ইব্রাহীম ফারুক ছিদ্দিকী জানান, একের পর এক দুর্ঘটনার ধারাবাহিক প্রাণহানির ঘটনার পর মহাসড়ক ৬ লেনের করার দাবি অনেক দিনের। এই নিয়ে মানববন্ধনসহ ধারাবাহিক কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কিন্তু দৃশ্যমান কিছু হচ্ছে না, তবে দৃশ্যমান কিছুই হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে সড়ক অবরোধ করতে হয়েছে। প্রশাসন ইতোমধ্যে ৭ দিনের মধ্যে অগ্রগতির আশ্বাস দিয়েছেন ফলে আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে দাবি না মানলে আবারও কর্মসূচির দেওয়ার কথা জানান তিনি।
এই সময় মহাসড়ক ব্যারিকেডের কারণে মহাসড়কের দু’পাশে লেগে যায় দীর্ঘ যানজট। দুর্ভোগে পড়েন পর্যটকসহ যাত্রীরা। অনেকে পায়ে হেঁটে রওনা দেন অবরোধের অংশ। কিন্তু এত দুর্ভোগের পরও তারাও বলছেন, দ্রুত ৬ লেনে উন্নীত করা হোক এই মহাসড়ক।
আরও পড়ুন
খুরুশকুলে বাসিন্দা রফিক আহমদ বলেন, প্রতিদিন নানা কারণেই এই সড়ক দিয়ে আসা যাওয়া। প্রায়শ শুনতে পায় ২-৩টা সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে। আমরা এই মহাসড়কে জীবন নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। আমরা যে আবার ঘরে ফিরব এটার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এটা জন্য এমন দাবি যৌক্তিক।
ঈদগাঁর বাসিন্দা ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে যে পরিমাণ ৩ চাকার গাড়ি রয়েছে, তা বাংলাদেশের আর কোনো মহাসড়কে আছে কিনা সন্দেহ রয়েছে। এই ৩ চাকার গাড়ির কারণে তো দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। এগুলো তো মহাসড়ক থেকে দূর করতে পারছে না প্রশাসন। এখন কাকে দোষ দেবেন?
চকরিয়া এলাকার বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি খুবই সরু। কিছু দূর পরপর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। লবণবোঝাই ট্রাক আর ৩ চাকার গাড়িগুলোর চলাচল বেশি। যার কারণে এই মহাসড়কে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বাস চালক রহিম উদ্দিন বলেন, কক্সবাজার একটি পর্যটন নগরী। বাংলাদেশের সব এলাকার মানুষ এখানে যাতায়াত। কিন্তু রাস্তা ছোট, যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেশি। তার ওপর ৩ চাকার দৌরাত্ম্য অনেক বেশি। এসব কারণে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে।

চকরিয়ার এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইফ বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন যান ও নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয় না। এই মহাসড়কে অসংখ্য বাঁক রয়েছে, লবণবোঝাই ট্রাক থেকে পানি পড়ে সড়ক পিচ্ছিল হচ্ছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এসব সমস্যা নিরসনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।
এদিকে হাইওয়ে পুলিশ বলছে, বেপরোয়া গতির যানবাহন ও অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এই মহাসড়ক চারলেন কিংবা ছয়লেনে উন্নীত করা ছাড়া বিকল্প নেই মনে করেন বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ।
কক্সবাজারস্থ মালুমঘাট হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে যানবাহনের বেপরোয়া গতি। হাইওয়ে পুলিশ সড়কে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযানে ৭০ থেকে ৮০ ওপরে গতি হলেই মামলা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও ৩ চাকার গাড়ি গুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারস্থ বিআরটিএ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘কক্সবাজার পর্যটন নগরী হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পর্যটকরা গাড়িযোগে কক্সবাজার আসছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে মহাসড়কটি অনেক ছোট আর যানবাহনের পরিমাণ অনেক বেশি। যদি এই মহাসড়কটি ৪ থেকে ৬ লেনে উন্নীত করা হয় তাহলে দুর্ঘটনা কমে আসবে।
সড়ক ও জনপদ অধিদফতর কক্সবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীতকরণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। এখন ফাইনাল রিপোর্টের অপেক্ষা আছি আমরা। ফাইনাল রিপোর্ট পাওয়ার পর পরবর্তী প্রক্রিয়ার কাজগুলো শুরু হবে।
প্রতিনিধি/এসএস