জেলা প্রতিনিধি
১৫ নভেম্বর ২০২৫, ১০:২৫ এএম
ব্যবসার পাওনা টাকা তুলতে প্রবাসী বন্ধু জরেজুল ইসলাম জরেজ মিয়ার সঙ্গে ঢাকায় যান কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হক। ঢাকা যাওয়ার পর থেকেই স্ত্রী লাকী বেগম আশরাফুলকে ফোন করলে তার প্রবাসী বন্ধু জরেজ ফোন রিসিভ করতেন। আশরাফুলের খোঁজ করলে তিনি বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত আছেন বলে জানান। দুইদিন ধরে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে বৃহস্পতিবার বিকেলে বদরগঞ্জ থানায় যান লাকী বেগম। পরে জানতে পারেন তার স্বামীকে ২৬ টুকরা করে হত্যা করা হয়েছে। আশরাফুল ইসলামকে হত্যার ঘটনায় প্রবাসী বন্ধু জরেজের দিক সন্দেহের আঙ্গুল তুলছেন ভুক্তভোগির পরিবার। তারা বলছে, জাপান যাওয়ার জন্য টাকা চেয়ে না পাওয়ায় হত্যা করতে পারে কিংবা টাকার লোভে পরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে।
শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) দুপুরে নিহত আশরাফুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্বজনদের আহাজারি। বাড়িতে অনেক লোকের উপস্থিতি। আমি অসুস্থ আমার চিকিৎসার খোঁজখবর কে নিবে বলে হু হু করে কাঁদছেন বাবা আব্দুর রশিদ। সন্তানদের কাছে নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন আশরাফুলের স্ত্রী লাকি বেগম। অন্যদিকে ছেলে ঢাকায় গেছে। ঢাকা থেকে ফিরে এসে মা মা করে ডাকবেন, সেই আশায় করুণ দৃষ্টিতে অপেক্ষায় এখনও নিহত আশরাফুলের মা।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে একটি ভ্যানে করে দুজন ব্যক্তি ড্রাম দুটি রাস্তার পাশে রেখে যায়। সন্ধ্যার দিকে ড্রাম থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে ড্রাম খুলে একটিতে চাল এবং অন্যটিতে কালো পলিথিনে মোড়ানো মানুষের দেহের খণ্ডিত অংশ পায়। প্রথমে পরিচয় শনাক্ত করা না গেলেও পরে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশ্লেষণে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হয় সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট।
নিহত আশরাফুল ইসলাম রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর নয়াপাড়া এলাকার আব্দুর রশিদের ছেলে। আশরাফুল ইসলাম প্রায় ৩০ বছর ধরে কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। তিনি ১২-১৪ বছর ধরে ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ ও আলু আমদানির ব্যবসা করতেন। আমদানির সরকারি লাইসেন্সও ছিল তার। সম্প্রতি তিনি ৭ হাজার বস্তা আলু ঢাকায় পাঠান এবং সেই টাকাসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীর কাছে বকেয়া টাকা তোলার জন্য গত মঙ্গলবার মালয়েশিয়া ফেরত বন্ধু জরেজের সঙ্গে ঢাকায় যান তিনি। বুধবার বিকেল ৫টায় আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে শেষ কথা হয় স্ত্রী লাকী বেগমের। এরপর থেকেই আশরাফুল ইসলামকে ফোন দিলে ফোন রিসিভ করে বন্ধু জরেজ। ফোন রিসিভ করে জরেজ বলেন, আশরাফুল ইসলাম বাইরে গেছে, কখনও ব্যস্ত আছে বলে কেটে দেন। বুধবার বিকেল থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ফোন জরেজ রিসিভ করলে আশরাফুলকে দেয়নি কথা বলার জন্য। পরে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে থানায় যান আশরাফুলের স্ত্রী লাকি বেগম। থানায় পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারেন তার স্বামীকে ২৬ টুকরা করে হত্যা করা হয়েছে।
অন্যদিকে একই এলাকার আজাদুল ইসলামের ছেলে জরেজুল ইসলাম জরেজ দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় থাকেন। তিনি সম্প্রতি দেশে এসেছেন। তার সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব ছিল আশরাফুল ইসলামের। এক মাস আগে মালয়েশিয়া থেকে এসে বন্ধু আশরাফুলের সঙ্গেই বেড়াতেন জরেজ।
আশরাফুল ইসলাম হত্যার বিষয়ে জরেজুল ইসলাম জরেজ এর স্ত্রীর উম্মে কুলসুম বলেন, আমার স্বামী জরেজ মিয়া দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় থাকেন। সম্প্রতি এক মাস হলো দেশে এসেছেন। আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে দীর্ঘ ২৫-৩০ বছরের বন্ধুত্বের সম্পর্ক। বন্ধু আশরাফুল ইসলাম চট্রগ্রামের ব্যবসায়ীর কাছে টাকা তুলতে যাবেন, তাই জরেজ মিয়াকে নিয়ে গেছেন তিনি।

স্ত্রী উম্মে কুলসুমের সঙ্গে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে কথা হয় জরেজ মিয়ার। তখন স্ত্রী উম্মে কুলসুম জিজ্ঞাসা করে, বাইরে মানুষ উল্টাপাল্টা কথা বলছে। এ বিষয়ে জরেজ মিয়া স্ত্রীকে বলেন, এগুলো সব মিথ্যা। আমি কিছু জানি না। রুমে ফোন রেখে আশরাফুল বাইরে গেছে। এরপর এগুলো শুনছি আমিও। আমি বাড়ির পথে রওয়ানা হলাম। এরপর থেকে স্বামী জরেজ মিয়ার মোবাইল বন্ধ পাওয়া গেছে। এরপর রাত ৩টার দিকে পুলিশ এসে তার শ্বশুর আজাদুল মোয়াজ্জেমকে থানায় নিয়ে গেছে এবং বাড়ির কয়েকটা মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে।
নিহত আশরাফুল ইসলামের শ্যালক রেজওয়ান বলেন, বুধবার বিকেলে বোনের সঙ্গে কথা হয় আশরাফুলের। তখন সে বোনকে জানায়, হাসপাতাল থেকে বাবাকে রিলিজ দেবে, টাকা পয়সা দিছি। বাবাকে নিয়া আইসো। এটাই শেষ কথা। এরপর থেকে আশরাফুলকে কল দিলে তার প্রবাসী বন্ধু জরেজ ফোন ধরে। আর বলে, আশরাফুল ব্যস্ত আছে, কালেকশনে গেছে।
তিনি আরও বলেন, জরেজ মিয়া সম্প্রতি জাপানে যাওয়ার জন্য দুলাভাই আশরাফুল ইসলামের কাছে ১০ লাখ টাকা চেয়েছিলেন। দুলাভাই টাকা দেননি। এ নিয়ে ভিতরে ভিতরে ক্ষোভ থাকতে পারে জরেজের। তাছাড়া ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা তোলার পর টাকার লোভে তাকে হত্যা করতে পারে জরেজ।
নিহত আশরাফুলের বাবা আব্দুর রশিদ বলেন, শনিবার থেকে রংপুর মেডিকেলে ভর্তি ছিলাম। ছেলে আমার দেখভাল করেছে। মেডিকেলে থাকা অবস্থায় মঙ্গলবার জরেজের সঙ্গে ঢাকা যায় আশরাফুল ইসলাম। জরেজ জাপানে যাবে তাই আশরাফুলের কাছে টাকা চেয়েছে। ঢাকায় মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জরেজকে দেওয়ার কথা ছিল। সেই টাকা তুলতে আশরাফুল ঢাকায় গেছে। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম আতিকুর রহমান বলেন, নিহতের পরিবার প্রবাসী বন্ধু জরেজকে এ বিষয়ে সন্দেহ করায় ইতোমধ্যে জরেজ এর পিতা আজাদুল মোয়াজ্জেমকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নানান দিক বিবেচনা করে তদন্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়াও নিহতের পরিবার ঢাকায় মামলা করার জন্য গেছেন। আমরা বিভিন্ন প্রকার তথ্য নিয়েছি। সেগুলো দিয়ে ঢাকার রমনা থানাকে সহযোগিতা করছি।
প্রতিনিধি/এফএ