images

সারাদেশ

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ফের নিলামের কনটেইনার গায়েব!

জেলা প্রতিনিধি

০৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:৩২ পিএম

চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ড থেকে প্রতিনিয়ত কনটেইনার গায়েবের ঘটনা ঘটছে। নিলাম থেকে পণ্য কিনে ডেলিভারি নেওয়ার সময় সেই পণ্য আর পাওয়া যাচ্ছে না। এতে নিলামে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। বিষয়টি নিয়ে তারা কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। 

শনিবার (০৮ নভেম্বর) দুপুরে এ তথ্য জানান নিলামে কেনা কনটেইনারটির স্বত্বাধিকার প্রতিষ্ঠান ফারজানা ট্রেডার্সের মোহাম্মদ সেলিম। তিনি বলেন, নিলামে পণ্য কেনার পর ডেলিভারি নেওয়ার সময় জানতে পারি কনটেইনারটি নেই। 

মোহাম্মদ সেলিম বলেন, বিষয়টি সুরাহার জন্য এখন কাস্টমস ও বন্দরের বিভিন্ন কর্মকর্তার দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। অথচ আমাদের পুরো টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। এখন চিন্তায় আছি, টাকা ফেরত পাব নাকি কনটেইনার খুঁজে পাব। বন্দর থেকে এর আগেও দুটি কনটেইনার হারিয়ে গিয়েছিল, সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই চলতি সপ্তাহে আরেকটি কনটেইনারের গায়েবের ঘটনা ঘটল বলে জানান তিনি।

মোহাম্মদ সেলিম জানান, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের নিলাম শাখার ৪০ ফুটের কনটেইনারটি ডেলিভারির জন্য অনেক খুঁজেও পাওয়া যায়নি। ফেব্রিকস পণ্যের কনটেইনারটি নিলাম থেকে কিনেছে ফারজানা ট্রেডার্স। তারা এরই মধ্যে কাস্টমসকে শুল্ক ও করসহ ৪৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। 

কিন্তু গত ২২ অক্টোবর ডেলিভারি নিতে জে-আর ইয়ার্ডে গিয়ে কনটেইনারটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি ইয়ার্ডের কর্মকর্তারা সুরাহা করতে না পারায় ফারজানা ট্রেডার্স পরদিন কাস্টমস কমিশনারের কাছে নিলাম বাতিল চেয়ে আবেদন করেন।

এর আগে দেড় কোটি টাকার কাপড়সহ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দুটি কনটেইনার গায়েব হয়েছিল। নিলামের পর সব শুল্ক-কর পরিশোধ করে বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারির সময় খবর আসে কনটেইনার দুটি নেই। প্রায় ৯ মাস আগে এ ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, টাকা ফেরত দিতে বন্দর ও কাস্টমস কেবল চিঠি চালাচালি করছে, কোনো অগ্রগতি নেই। 

গত ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলামে ৮৫ লাখ টাকায় প্রায় ২৭ টন ফেব্রিক্সের কনটেইনার কেনেন শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের মালিক সেলিম রেজা। তিনি প্রথমে কনটেইনারের পণ্য পরিদর্শন করেন। পরে ১ কোটি ৭ লাখ টাকায় শুল্ক, দাম এবং বন্দরের চার্জ পরিশোধ করেন। কিন্তু ২৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাক নিয়ে ইয়ার্ডে গেলে জানানো হয়, কনটেইনারটাই নেই। এ ঘটনার ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো হদিস মেলেনি।

ভুক্তভোগী সেলিম রেজা বলেন, কাস্টমস কমিশনার বরাবর তিনটি চিঠি দিয়েছি। আমাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের আর্থিক ক্ষতি এক কোটি টাকার বেশি। বারবার চিঠি দেওয়ার পরেও আমার টাকা ফেরত পাইনি। আরেকটি কনটেইনার নিলামে কিনেছিলেন তপন সিংহ নামে এক ব্যবসায়ী। তিনিও ৪২ লাখ টাকা শুল্ক কর পরিশোধ করেও কনটেইনার পাননি। 

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের নিলামকারী ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব চৌধুরী বলেন, বন্দর ইয়ার্ড থেকে শুধু কনটেইনার নয়, নানা সরঞ্জাম গায়েব হচ্ছে। একের পর এক কনটেইনার গায়েব হওয়ার ঘটনায় আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। 

ক্ষোভ প্রকাশ করে ইয়াকুব চৌধুরী বলেন, বন্দর ইয়ার্ডের মতো সুরক্ষিত জায়গা থেকে কীভাবে কনটেইনার গায়েব হয়, তা আমাদের বুঝে আসে না। বাইরে পণ্য থাকলে চুরি হতে পারে, কিন্তু বন্দরের এমন সুরক্ষিত বেষ্টনীর ভেতর কীভাবে চুরি হয়। সেনা, নৌবাহিনী, বন্দরের নিজস্ব সিকিউরিটি থাকার পরও পণ্য কীভাবে বাইরে যায়? বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে জনগণের সামনে পরিষ্কার করা দরকার। কারণ এমন বিষয় মেনে নেওয়ার মতো নয়। এ ধরনের ঘটনা সত্যিই যদি ঘটে, তাহলে বহির্বিশ্বে আমাদের বন্দর সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়বে। 

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের নিলাম শাখার সহকারী কমিশনার রাসেল আহমেদ বলেন, কনটেইনার বন্দরের ইয়ার্ডে না থাকা খুব আশ্চর্যজনক ব্যাপার। কনটেইনার হয়তো অন্য কোনো ইয়ার্ডে স্থানান্তরিত হতে পারে। গায়েব হয়ে যাওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। 

রাসেল আহমেদ বলেন, আমরা এ বিষয়ে প্রথমে বন্দরে চিঠি দিয়ে পণ্য পাওয়া যায় কি না জানতে চাইব, পণ্য পাওয়া না গেলে রিফান্ড প্রক্রিয়া শুরু হবে। নিলামে ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ওই টাকা ফেরত পাবে। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই প্রতিষ্ঠানের।  

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, আগের দুটি কনটেইনার মিসিংয়ের ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। নতুন করে আরও একটি কনটেইনার মিসিং হওয়ার খবর আমার জানা নেই। তবে মনে হয় হ্যান্ডলিংয়ের সময় একটি কনটেইনার যে স্থানে থাকার কথা সেখানে নেই। অন্য কোথাও ঠিকই রয়েছে। খোঁজা হচ্ছে। মিসিং হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 

ওমর ফারুক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে সবসময় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার কনটেইনার রয়েছে। কোনটি কোথায় রয়েছে তা সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আশা করছি, কনটেইনারগুলো পাওয়া যাবে। পাওয়া গেলে জানানো হবে।  

প্রতিনিধি/ক.ম/