১৮ অক্টোবর ২০২৫, ০২:৪০ পিএম
চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক জিনসের সাতটি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে এসব কারখানায় কর্মরত ৩৫ হাজারের বেশি শ্রমিক নিশ্চিত কর্মহীনতার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অনুকূল কর্মপরিবেশ না থাকায় তাদের সাতটি কারখানা একসঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্যাসিফিক জিনস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) প্যাসিফিক জিনস গ্রুপের পক্ষ থেকে পৃথক পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এক পর্যায়ে কিছু শ্রমিক কাজ বন্ধ রেখে মারামারি, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িয়ে পড়ে। এতে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিক সব পক্ষের মানুষ আহত হন।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই পরিস্থিতিতে কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি শ্রম আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ ধর্মঘট হিসেবে গণ্য হওয়ায়, বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (ধারা ১৩-ক) অনুযায়ী কারখানাগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
কারখানাগুলো হলো— প্যাসিফিক জিনস, জিনস ২০০০, ইউনিভার্সেল জিনস, এনএইচটি ফ্যাশন, প্যাসিফিক এক্সেসরিজ, প্যাসিফিক ওয়ার্কওয়্যার এবং প্যাসিফিক অ্যাটায়ার্স। এর মধ্যে প্যাসিফিক জিনসের দুটি ইউনিট ও ইউনিভার্সেল জিনসের চারটি ইউনিট রয়েছে। যেখানে কর্মরত ছিলেন প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক।
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, আমরা কারখানা বন্ধের চিঠি পেয়েছি। কারখানা বন্ধের ঘোষণা শ্রম আইনের আওতাভুক্ত। এটি মালিকপক্ষের অধিকার। যত দিন কারখানা বন্ধ থাকবে, শ্রমিকেরা তত দিন কোনো বেতন পাবেন না।
তিনি আরও বলেন, বৃহস্পতিবার সকালেই প্যাসিফিক জিনস গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এনএইচটি ফ্যাশনসের সামনে শ্রমিকদের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে অন্তত ৭ জন আহত হন এবং শিল্প পুলিশের পাহারায় তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
শ্রমিকদের এক পক্ষ অভিযোগ করেছে, কারখানার কর্মকর্তারা আমাদের মারধর করেছে। অপরদিকে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দাবি, কিছু শ্রমিক ইচ্ছাকৃতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। এতে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্যাসিফিক জিনস গ্রুপে শ্রমিক অস্থিরতা নতুন কিছুই নয়। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেও একই ধরনের ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক ক্যাজুয়েলস লিমিটেডের দুটি ইউনিট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন বিক্ষোভরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন।
এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, ইপিজেডের ভেতরে শিল্প পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সে ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও আজও কোনো গ্রেফতার হয়নি। শ্রমিকদের একাংশের অভিযোগ, মামলার মাধ্যমে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে।
# প্যাসিফিক জিনসের সাতটি পোশাক কারখানা একসঙ্গে বন্ধ
# কর্মহীনতার ঝুঁকিতে ৩৫ হাজার শ্রমিক
# বাইরের ইন্ধন আছে কি না খতিয়ে দেখছে পুলিশ
সেই থেকে প্যাসিফিক জিনসে শ্রমিকদের মধ্যে কিছু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আছে। দ্বন্ধ থেকে বৃহস্পতিবার ফের সংঘাত-সংঘর্ষ, মারামারি। তবে এ ঘটনায় বাইরে থেকে কেউ ইন্ধন দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে বাইরে থেকে ইন্ধন আসতে পারে। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান শিল্প পুলিশের এই কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রামের সিইপিজেড দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল। সেখানে টানা সংঘর্ষ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের স্থিতিশীলতায় নতুন প্রশ্ন তুলেছে। এই সংঘর্ষকে পোশাকশিল্পে অস্থিরতার নতুন ইঙ্গিত বলে মনে করছেন শিল্প বিশেষজ্ঞরা।
শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহু বছর ধরে সফলভাবে রপ্তানি করা প্যাসিফিক জিনসের মতো গ্রুপে বারবার অস্থিরতা দেখা দিলে তা দেশের সামগ্রিক পোশাকশিল্পের ওপর আঘাত আসতে পারে। নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে রপ্তানি আয়ের ওপর। যা দেশের জন্য কখনোই মঙ্গলজনক নয়।
সূত্র মতে, প্যাসিফিক জিনস গ্রুপে বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ৩৫ হাজারের বেশি। এই কারখানাগুলোর হঠাৎ বন্ধ ঘোষণা শ্রমিকদের জীবিকায় মারাত্নক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক শ্রমিক অভিযোগ করেছেন, তারা বৃহস্পতিবার কাজে গেলেও হঠাৎ কারখানায় ঢুকতে পারেননি।
আরও পড়ুন
সুস্মীতা নামে একজন নারী শ্রমিক বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে কাজে গিয়ে দেখি গেটে তালা। কেউ কিছু জানায়নি। পরে শুনেছি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এখন আমরা কোথায় যাব? কোথায় কাজ করব। বেতন না পেলে তো পেটে ভাত দেওয়াও মুশকিল হয়ে পড়বে।
এনামুল হক নাবিদ নামে এক শ্রমিক বলেন, কারখানার সব শ্রমিক তো সংঘাত-সংঘর্ষে জড়ায়নি। যারা জড়িয়েছে তারা সংখ্যাই বেশি নয়। তারা দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও জড়িত। কারাখানা কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে না। প্রয়োজনে তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হোক। তাদের কারণে কারখানাগুলোর হাজার হাজার নিরপরাধ শ্রমিক কেন কষ্ঠ পাবে।
এ বিষয়ে জানতে কারখানাগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীরকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য বা মতামত প্রকাশে রাজি হননি।
প্রতিনিধি/টিবি