১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৪:৩০ পিএম
২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধনের পর থেকে আজ রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল পর্যন্ত তিন বছর ২ মাস ২০ দিনের ব্যবধানে পদ্মা সেতুর ওপর বিভিন্ন যানবাহনের দুর্ঘটনায় মোট ১১ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া এসব ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছে প্রায় ৫৫ জন। এদের মধ্যে অনেকের রাজধানীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ গেছে।
যানবাহন চালকদের বেপরোয়া গতি, ওভারট্রাকিংয়ের প্রবণতা এবং সেতুতে চলাচলের নিয়ম শৃঙ্খলা না মানার ফলে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করেছে।
পদ্মা সেতুর উত্তর থানা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন দুর্ঘটনার মধ্যে ২০২২ সালে সেতু উদ্বোধনের পর নিহত হয়েছে ৩ জন, আহত হয়েছে ৩০ জন। এরপর ২০২৩ সালে ৭ জন গুরুতর আহত হয়, ২০২৪ সালে ৬ জন নিহত হয় এবং চলতি ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ জন নিহত ও ১৭ জন আহত হয়েছে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের দুর্ঘটনায়।
সেতু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, হাইওয়ে পুলিশ ও পদ্মা সেতুর উত্তর থানার সংশ্লিষ্টরা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বছরওয়ারী হিসেবে দেখা গেছে, ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধনের পরদিন ২৬ জুন যানবাহন ও যাত্রী পারাপারের জন্য সেতু খুলে দেওয়ার প্রথমদিনেই পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত হয়। পদ্মা সেতুর ওপর এটাই প্রথম দুর্ঘটনা বলে সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
একই বছরের ২ জুলাই পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের টোল প্লাজার সামনে ঢাকাগামী অন্তরা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস জাজিরা টোল প্লাজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মাইক্রোবাসকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে সিরাজগঞ্জ থেকে পদ্মা সেতু দেখতে আসা ১২ যাত্রী গুরুতর আহত হয়। এর মধ্যে আব্দুল হক নামের একজন যাত্রী নিহত হয় এবং বাস ও মাইক্রোবাসের ২৫ যাত্রী গুরুতর আহত হয়।
এরপর কয়েক মাসের ব্যবধানে, ২০২২ সালের ১৫ ডিসেম্বর ঘন কুয়াশার কারণে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের ১৯ নম্বর খুটির কাছে পরপর ৩টি যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে এক কিশোরসহ ৫ জন গুরুতর আহত হয়।
পরের বছর, ২০২৩ সালে পদ্মা সেতুর ওপর দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বাসের হেলপার ও এক যাত্রী আহত হয়। ওইদিন বিকেলে পদ্মা সেতুর ১৪ ও ১৫ নম্বর খুটির মাঝামাঝি স্থানে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর ১৪ নম্বর খুটির কাছে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে ৫ জন আহত হয়। এর মধ্যে দু’জন গুরুতর জখম হয় বলে পদ্মা সেতু উত্তর থানার পুলিশ জানিয়েছে।
তারপরের বছর, ২০২৪ সালের ১২ এপ্রিল সকালে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তের ১১ ও ১২ নম্বর খুটির মাঝামাঝি স্থানে দ্রুতগতির মোটরসাইকেলের ধাক্কায় এক মাইক্রোবাস চালক নিহত হয়। ওইদিন নিহত চালক মাইক্রোবাসের চাকা মেরামত করতে নামলে পেছন থেকে দ্রুতগতির মোটরসাইকেলের ধাক্কায় দুর্ঘটনা ঘটে।
একই বছরের ১৫ আগস্ট মোটরসাইকেলযোগে ফেসবুক লাইভ দিতে দিতে পদ্মা সেতু পার হওয়ার সময় সেতুর জাজিরা প্রান্তের নাওডোবা এলাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ইনজামুল হক সুমন (৩৪) নামের সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী নিহত হয়।
পদ্মা সেতুর দক্ষিণ থানার ওসি শেখ শরিফুল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, নিহত ইনজামুল হক সুমন আইনজীবী সমিতির সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন।
২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর রাতে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের টোল প্লাজার পাশে দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হয়।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ৪ জন হলেন—জাজিরা উপজেলার ফরাজী কান্দি এলাকার নাবিল ফরাজী (১৮), সায়েম মাদবর (১৯), মোসলেম ঢালি কান্দি এলাকার আরমান ঢালী (১৮) ও খিদির মাদবর (২০)।
অন্যদিকে চলতি বছরের (২০২৫) ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা সেতুর ৩০ নম্বর খুটির কাছে ঢাকা থেকে ভাঙ্গাগামী একটি যাত্রীবাহী বাস সামনে থাকা একটি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সকে ধাক্কা দিলে পেছনের অংশ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে অ্যাম্বুলেন্সের থাকা ৫ যাত্রী গুরুতর আহত হয়।
হাঁসাড়া হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, একই বছরের ১৩ জুন পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে ঢাকামুখী একটি ট্রাকের পেছনে দ্রুতগতির একটি বাসের ধাক্কায় দুই জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়। এ ঘটনায় পদ্মা সেতুর ঢাকামুখী লেন প্রায় ২ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকায় যানজট সৃষ্টি হয়েছিল।
হাঁসাড়া হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আবু নাঈম সিদ্দিকি ও পদ্মা সেতুর উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রুবেল হাওলাদার, পিপিএম এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিভিন্ন দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উত্তর থানার (ওসি) রুবেল হাওলাদার বলেন, ‘পদ্মা সেতুতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যানবাহন চালকদের সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত যেকোন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সেতুর উভয় প্রান্তে হাইওয়ে পুলিশ, পদ্মা সেতুর নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী সহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেতুর বিভিন্ন পয়েন্টে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। সেতুর ওপর নিয়ম-শৃঙ্খলা ও সুনির্দিষ্ট গতিতে নিয়ম মেনে যানবাহন চালালে, এমন দুর্ঘটনা আরও কমে আসবে।’

তবে সেতুতে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ধরে রাখতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং জোরদারের তাগিদ দেন সেতু ব্যবহারকারীরা, যানবাহন চালক ও সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিনিধি/একেবি