images

সারাদেশ

ইলিশের স্বাদ ভুলতে বসেছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা

জেলা প্রতিনিধি

২৬ আগস্ট ২০২৫, ১২:৫৪ পিএম

বর্ষার ভরা মৌসুমেও দক্ষিণাঞ্চলের জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। অল্প পরিমাণে মাছ বাজারে পাওয়া গেলেও তার দাম আকাশচুম্বী। বর্তমানে ইলিশ মণপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ১২ হাজার টাকায়। ফলে কেজিপ্রতি দাম দাঁড়াচ্ছে ১৭শ থেকে ২৮শ টাকা। এর মধ্যেও যদি দুই কেজি বা তার চেয়ে বড় ইলিশ পাওয়া যায়, তাহলে প্রতি কেজিতে দাম আরও বেশি। দাম নাগালের বাইরে থাকায় এখন রূপালী ইলিশের স্বাদ ভুলতে বসেছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা।

মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য বন্দর ঘুরে দেখা গেছে, ৪০০ গ্রাম সাইজের প্রতি মণ ইলিশের দাম ৬৮ থেকে ৭০ হাজার, ৮-৯শ গ্রাম সাইজের প্রতি মণ ইলিশ এক লাখ টাকা। এক কেজির বেশি সাইজের প্রতি মণ ইলিশ এক লাখ আট থেকে এক লাখ ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের ইলিশের দাম গত দশ দিনের ব্যবধানে মণপ্রতি ১২ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

পটুয়াখালীর সাগরপাড়ের জেলে ও ব্যবসায়ী এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈশাখ থেকে আশ্বিন এ ছয় মাস ইলিশের পুরো ভরা মৌসুম। তাদের হিসাব মতে, মৌসুমের অর্ধেকের বেশি সময় প্রায় শেষ। ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার পর থেকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে উপকূলের নদী ও সমুদ্রে মিলছে না ইলিশের দেখা। ফলে তাদের দাদন আর ঋণের বোঝা দিন দিন ভারি হচ্ছে। এতে এই পেশার সঙ্গে জড়িত জেলে, আড়তদার ও সাগরপাড়ের জেলা পটুয়াখালীর লাখ লাখ মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে হতাশা।

-মাছ-1-e1568894533615

কলাপাড়ার সমুদ্রগামী ফিশিং বোটের প্রধান মাঝি খলিল উদ্দিন জানান, ভারত ও মিয়ানমারের পতাকাবাহী শতাধিক অত্যাধুনিক জাহাজ সব সময় সাগরের বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থান করছে। প্রতিটি জাহাজের সঙ্গে রয়েছে ২০-২৫টি মাছ ধরার ছোট ট্রলার। সেসব ট্রলার থেকে যান্ত্রিক উপায়ে এক ধরনের জাল ফেলা হয় সাগরে। তিন স্তরের ওই জাল ভেদ করে ছোট-বড় কোনো ইলিশই বাংলাদেশ সীমান্তে আসতে পারছে না। ফলে দিন-রাত উত্তাল সাগরে জাল ফেলে মাছ না পেয়ে খালি হাতে তাদের ঘাটে ফিরতে হচ্ছে। লোকসানের মুখে পড়ছেন ট্রলার মালিকসহ উপকূলের জেলেরা। এ কারণে বর্ষার ভরা মৌসুমেও দক্ষিণাঞ্চলের জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। দিন দিন তারা ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন বলেও জানান।

পটুয়াখালীর নিউ মার্কেট কাঁচাবাজারে ইলিশ কিনতে আসা ব্যবসায়ী করিম গাজী বলেন, পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য ৪৬শ টাকা দিয়ে ১ কেজি ২২ গ্রাম ওজনের দুটি ইলিশ কিনলাম। এ বাজারে সাত-আট বছর আগেও আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে প্রতিদিন মণে মণে ইলিশ উঠত। অথচ এখন ইলিশই নেই। তারপর নানা হাত পেরিয়ে সিন্ডিকেটের কারণে এত বেশি দাম হয় যে আমাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় মৎস্য বন্দর মহিপুর-আলীপুর। এ দুই বন্দরের জেলেরা জানান, ইলিশ না পেয়ে কষ্টে দিন কাটছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে ঋণের বোঝা।

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার জেলে সুজন আকন বলেন, নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে সাগর উত্তাল। ঘন ঘন সিগন্যাল থাকায় সাগরে গিয়ে জেলেরা টিকতে পারেন না। তাছাড়া সাগরেও চাহিদামতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।

thumbnail_images

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশ লোনা পানির মাছ হলেও ডিম ছাড়ার সময় চলে আসে মিঠা পানিতে। প্রজননের সময়ে ইলিশের অনুকূল পরিবেশ ও প্রতিবেশের প্রয়োজন হয়। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তনে তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে এর প্রভাব পড়বে মৎস্য সম্পদ আহরণের ওপর। এতে কর্মহীন হয়ে পড়বে এ পেশার সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ মানুষ।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মৎস্য অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. সাজেদুল হক জানান, ইলিশ কম পাওয়ার কারণ হিসেবে জলবায়ুর প্রভাব তো আছেই, তারপর সাগরের অতিরিক্ত লবণাক্ততা, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি, অসংখ্য ডুবোচর, নদীর নাব্যতা হ্রাস, অবৈধ জালের ব্যবহারের ফলে সাগরের মাছ ইলিশের নদীতে এসে মাইগ্রেশন দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণেই ইলিশের এই দুস্প্রাপ্যতা।

মহিপুর মৎস্য বন্দর আড়তদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুমন দাস জানান, অস্বাভাবিক বৃষ্টি, অতি খরা ও নদীতে ফেলা ময়লা সাগরের তলদেশে জমে অক্সিজেনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। যার জন্য সাগরের উপারিভাগে মাছের বিচরণ কমে যাওয়ায় তীরে ইলিশ খুবই কম আসছে। এসব কারণেই ইলিশের এ সংকট।

কলাপাড়ার উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার বিমাতাসুলভ আচরণ, জেলের ইলিশ শিকারের আধুনিক সরঞ্জামাদির অভাব, সাগরের ৩০-৪০ কিমি এলাকায় ডুবোচর, নাব্য সংকট ও দূষণের কারণে ইলিশের মাইগ্রেশন হচ্ছে না। যার কারণে উপকূলে পুরো ভরা মৌসুমেও চলছে ইলিশের চরম আকাল।

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, আবহাওয়া পরিবেশ-প্রতিবেশ সবকিছু অনুকূলে থাকলে চলতি অর্থবছরেও ৭২ থেকে ৮০ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

প্রতিনিধি/টিবি